পর্তুগালের রাজধানী লিসবনের রাস্তায় নামলেন হাজার হাজার শ্রমিক, কর্মচারী ও নাগরিক। সরকারের প্রস্তাবিত নতুন শ্রম আইন সংশোধনের বিরুদ্ধে এই বিশাল বিক্ষোভে অংশ নেয় অন্তত এক লাখ মানুষ। বিক্ষোভকারীদের দাবি, প্রস্তাবিত আইনটি শ্রমিকদের অধিকার ও নিরাপত্তাকে গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
কী পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে নতুন শ্রম আইন?
কেন্দ্র-ডানপন্থী সরকার এমন একটি শ্রম আইন প্রণয়নের পরিকল্পনা করছে, যেখানে নিয়োগদাতারা সহজে কর্মী ছাঁটাই করতে পারবেন। কাজ অন্য প্রতিষ্ঠানে আউটসোর্সিং করা আরও সহজ হবে, এবং সহানুভূতিমূলক ছুটি বিশেষত গর্ভপাতজনিত শোককালীন ছুটি সীমিত বা কমানো হবে।
সরকার বলছে, এসব পদক্ষেপ কর্মক্ষেত্রে নমনীয়তা ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করবে এবং দেশের দুর্বল অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়াতে সহায়তা করবে। বর্তমানে পর্তুগাল পশ্চিম ইউরোপের সবচেয়ে কম আয়ের দেশগুলোর একটি, যেখানে উৎপাদনশীলতা ও বিনিয়োগ দুটোই নিম্নমুখী। তবে শ্রমিক সংগঠনগুলো একে শ্রমিকবিরোধী ও অন্যায্য উদ্যোগ বলে সমালোচনা করেছে।
পর্তুগালের সবচেয়ে বড় শ্রমিক সংগঠন-সিজিটিপি-এর মহাসচিব তিয়াগো অলিভেইরা বলেছেন…
এই আইন বাস্তবায়িত হলে এটি আমাদের প্রত্যেকের জীবনে ভয়াবহ পশ্চাদপদতা বয়ে আনবে।তিনি ঘোষণা দেন, ১১ ডিসেম্বর সারাদেশে একদিনের সাধারণ ধর্মঘট পালন করা হবে।
বিক্ষোভে উত্তাল লিসবন
সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানায়, প্রায় এক লাখেরও বেশি বিক্ষোভকারী লিসবনের প্রধান সড়ক অ্যাভেনিদা দা লিবেরদাদে জুড়ে অবস্থান নেয়। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস-এপি জানায়, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন শ্রমিক, শিক্ষক, নার্স, সরকারি কর্মকর্তা ও শিক্ষার্থীরা।
৩১ বছর বয়সী চিকিৎসা সরঞ্জাম কোম্পানির কর্মী মিরিয়াম আলভেস বলেন…
এই সংস্কার শ্রম পরিবেশকে স্পষ্টভাবে পিছনে ঠেলে দেবে এবং চাকরির নিরাপত্তাকে সম্পূর্ণরূপে অনিশ্চিত করে তুলবে।
আরেকজন অংশগ্রহণকারী, ৩৪ বছর বয়সী আর্কাইভ টেকনিশিয়ান মাদালেনা পেনা অভিযোগ করেন…
সরকার নির্বাচনের আগে কিছু না বলেই গোপনে শ্রমিক অধিকার সংকুচিত করার ষড়যন্ত্র করছে।
বিল পাসের সম্ভাবনা ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
প্রস্তাবিত বিলটি ডানপন্থী দল শেগার সমর্থনে সহজেই সংসদে পাস হতে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্টেনেগ্রোর সরকার বলছে, শ্রম বাজারে অত্যাধিক কঠোরতা বিনিয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে। তবে বিরোধীদল সোশ্যালিস্ট পার্টি-পিএস বলেছে, এই আইন শ্রমিকদের নয়, কেবল বড় কর্পোরেশনগুলোর পক্ষে কাজ করবে।
বেতন বৈষম্য ও জীবিকা সংকট
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পর্তুগালের অর্ধেকেরও বেশি শ্রমিক মাসে ১,০০০ ইউরোর কম আয় করেন, যেখানে ন্যূনতম মজুরি মাত্র ৮৭০ ইউরো। শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর দাবি, বেতন না বাড়িয়ে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির কথা বলা একপ্রকার ভাঁওতা।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জীবনযাত্রার ব্যয় দ্রুত বাড়লেও বেতন বৃদ্ধি স্থবির হয়ে আছে। এর ফলে যুবসমাজ ও দক্ষ কর্মীদের বিদেশে চলে যাওয়ার হার বেড়ে যাচ্ছে, যা পর্তুগালের অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ।
বিক্ষোভকারীদের মতে, এই ঘটনাটি শুধু একটি আইন বিরোধী আন্দোলন নয় এটি শ্রমিক মর্যাদা, সামাজিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচারের আন্দোলন। তারা বলছেন, পর্তুগাল এক নতুন রাজনৈতিক মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে অর্থনৈতিক সংস্কারের আড়ালে শ্রমিক অধিকার সংকুচিত করার চেষ্টা চলছে।
