বৃহস্পতিবার, ১৫ই জানুয়ারি, ২০২৬   |   ২রা মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

পর্তুগাল আর স্পেনের সীমান্ত পেরোনো অনেক সময় টেরই পাওয়া যায় না। হয়তো রাস্তার রঙ বা মানে সামান্য পার্থক্য চোখে পড়বে, ভবনের ধরনে পরিবর্তন ধরা দেবে, কিংবা দেখা মিলবে ছোট্ট একটি সাইনবোর্ডের, ‘আপনি স্পেনে প্রবেশ করেছেন’ বা ‘পর্তুগালে স্বাগতম’। সীমান্তে নেই কোনো প্রহরী, অস্ত্র কিংবা পাসপোর্টে সিল মারার আনুষ্ঠানিকতা।

মিনহো নদীর ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ‘ইন্টারন্যাশনাল ব্রিজ’ সীমান্তের সবচেয়ে পরিচিত স্থান। এই সেতুর মাঝ বরাবর চলে গেছে দুই দেশের সীমারেখা। ফলে এখানে দাঁড়িয়ে একই সঙ্গে স্পেন ও পর্তুগালে পা রাখা যায়। টুই (স্পেন) ও ভ্যালেন্সাকে (পর্তুগাল) যুক্ত করা এই সেতুটি অনেক ভ্রমণকারীর কাছে এক ধরনের প্রতীকী অভিজ্ঞতা, যেন মুহূর্তটিকে ক্যামেরাবন্দি করার এক অনন্য সুযোগ।

শেনজেন চুক্তি ও সীমান্তহীন ভ্রমণ

বর্তমানে এই সীমান্তে বাধাহীন যাতায়াত সম্ভব হয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগদান ও শেনজেন চুক্তির কারণে। ১৯৮৬ সালের ১লা জানুয়ারি একই দিনে স্পেন ও পর্তুগাল ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ লাভ করে। এরপর ১৯৯১ সালে দেশদুটি শেনজেন চুক্তিতে সই করে। পরবর্তীতে ১৯৯৫ সালে সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ তুলে নেয়।

শেনজেন এলাকা বর্তমানে ইউরোপের ২৯টি দেশকে নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে ২৫টি ইইউ সদস্য রাষ্ট্র এবং আরও ৪টি অ-ইইউ দেশ – আইসল্যান্ড, নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড ও লিশটেনস্টাইন। এই এলাকাকে বলা হয় ইউরোপের সীমান্তবিহীন ভ্রমণ জোন, যেখানে দেশগুলোর মধ্যে চলাচলের জন্য আলাদা করে সীমান্ত চেক করতে হয় না, এক দেশ থেকে আরেক দেশে যেতে দেখাতে হয় না পাসপোর্টও।

শেনজেন চুক্তির সূত্রপাত ১৯৮৫ সালের ১৪ জুন, লুক্সেমবার্গের শেনজেন শহরে। প্রথমে বেলজিয়াম, ফ্রান্স, পশ্চিম জার্মানি, লুক্সেমবার্গ ও নেদারল্যান্ডস—এই পাঁচ দেশ মিলে চুক্তি সই করে। সেখান থেকেই এর নামকরণ।

ব্রেক্সিটের পর নতুন নিয়ম

তবে যুক্তরাজ্যের নাগরিকদের জন্য শেনজেনের নিয়ম এখন ভিন্ন। ব্রেক্সিটের পর তারা আর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য হিসেবে সুবিধা পান না। শেনজেন এলাকায় প্রবেশের ক্ষেত্রে ব্রিটিশ নাগরিকরা সর্বোচ্চ ৯০ দিন থাকতে পারেন, তবে তা একটি চলমান ১৮০ দিনের সময়সীমার মধ্যে। অর্থাৎ, প্রতিটি দিন গোনা হয় পেছনের ১৮০ দিনের সময়কাল থেকে।

এই সময়সীমা গণনা অনেকের কাছে বিভ্রান্তিকর হয়ে ওঠে। তাই ভ্রমণকারীদের সুবিধার্থে বিভিন্ন অনলাইন ওয়েবসাইট ও মোবাইল অ্যাপ রয়েছে, যেখানে তারিখ উল্লেখ করলে শেনজেনের ৯০/১৮০ দিনের নিয়ম অনুযায়ী কতদিন থাকা যাবে তা হিসাব করে দেওয়া হয়।

সীমান্ত পেরোতে ভাড়া গাড়ি

পর্তুগালে গাড়ি ভাড়া নিয়ে স্পেনে ঢোকা সাধারণত সম্ভব। তবে এজন্য ভাড়ার কোম্পানিকে আগেই জানাতে হয় এবং অনেক সময় বাড়তি বীমা ফি দিতে হয়। সব কোম্পানির নিয়ম এক নয়, তাই আগেই যাচাই করে নেওয়া জরুরি।

এ ছাড়া পর্তুগালের ভাড়া গাড়িতে যে ইলেকট্রনিক টোল ট্রান্সপন্ডার থাকে, তা স্পেনে কাজ নাও করতে পারে। ফলে সেখানে নগদ বা কার্ডে টোল পরিশোধ করতে হয়।

ইউরোপের দীর্ঘতম সীমান্ত ‘দ্য স্ট্রাইপ’

পর্তুগাল–স্পেন সীমান্তকে বলা হয় ইউরোপের দীর্ঘতম অবিচ্ছিন্ন সীমান্ত। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১,২১৪ কিলোমিটার। স্থানীয়ভাবে এটি ‘দ্য স্ট্রাইপ’ নামেও পরিচিত। ১২৯৭ সালের আলকানিসেস চুক্তির পর থেকে এই সীমান্তে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি।

এ সীমান্ত মূলত প্রাকৃতিক ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য দিয়ে চিহ্নিত। গুয়াদিয়ানা নদী এর একটি বড় অংশ জুড়ে প্রবাহিত হয়ে দুই দেশকে আলাদা রেখেছে। পাশাপাশি বিভিন্ন পাহাড়শ্রেণি ও নদনদীও প্রাকৃতিক সীমানা টেনে দিয়েছে। যদিও অনেকে ভুল করে পিরেনিস পর্বতমালা উল্লেখ করেন, বাস্তবে এই পর্বতশ্রেণি স্পেনকে ফ্রান্স থেকে আলাদা করেছে, পর্তুগালের সঙ্গে নয়।

দেয়াল, কাঁটাতার বা প্রহরী ছাড়াই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টিকে থাকা এই সীমান্ত তাই এক অর্থে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানেরও প্রতীক। ইউরোপের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় ধরে অপরিবর্তিত থাকা সীমান্তগুলোর মধ্যে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়।

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version