সোমবার, ১৪ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬   |   ৩০ই ভাদ্র, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সদস্য রাষ্ট্রগুলোর তীব্র চাপের মুখে অবৈধ বা অনিয়মিত অভিবাসন ঠেকাতে নিজেদের অবস্থান আরও কঠোর করতে যাচ্ছে ইউরোপীয় কমিশন। উত্তর আফ্রিকার স্প্যানিশ ছিটমহল সেউতা সংকটের প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের তিনটি নীতিগত পরিবর্তন আনার কথা ভাবা হচ্ছে, যা চলতি সপ্তাহে কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লিয়েন তাঁর বার্ষিক ‘স্টেট অব দ্য ইউনিয়ন’ ভাষণে ঘোষণা করতে পারেন।

গত ৩০ জুলাই সেউতায় এক দিনেই প্রায় ৮০ হাজার মানুষের নজিরবিহীন প্রবেশের ঘটনাটি ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে অভিবাসন আইন কঠোর করার রাজনৈতিক তাগিদকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। ইউরোপীয় কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সংবাদমাধ্যম ‘ইউরোনিউজ’ জানিয়েছে, ২০২৩ সাল থেকে সামগ্রিকভাবে সীমান্ত পারাপার ও আশ্রয়ের আবেদন কমলেও, বহিরাগত সীমান্ত সুরক্ষিত করতে এবং অবৈধ অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর গতি বাড়াতে এই তিনটি বিকল্প এখন আলোচনার টেবিলে রয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক কর্মকর্তা ইউরোনিউজকে বলেন, ‘চলতি গ্রীষ্মে আমরা যে দৃশ্য দেখেছি তা ইউরোপীয়দের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। অভিবাসন নিয়ে বড় কোনো ঘোষণা এবার নিশ্চিতভাবেই আসতে যাচ্ছে।’

প্রথম এবং সবচেয়ে বড় পরিবর্তনের প্রস্তাবটি হলো—হঠাৎ করে বিপুলসংখ্যক মানুষের অনুপ্রবেশ ঘটলে সাময়িকভাবে আশ্রয় বা ‘অ্যাসাইলামের অধিকার স্থগিত’ করা। এই নিয়ম কার্যকর হলে সেউতার মতো পরিস্থিতিতে অবৈধভাবে প্রবেশকারীদের আশ্রয়ের আবেদন গ্রহণ করতে ইইউভুক্ত দেশগুলো আর বাধ্য থাকবে না। বর্তমানে যেকোনো উপায়ে ইইউতে প্রবেশ করলেই ব্যক্তিগতভাবে আশ্রয়ের আবেদন করার অধিকার রয়েছে। এর আগে লিবিয়া থেকে আসা অভিবাসীদের ক্ষেত্রে গ্রিস এবং বেলারুশ সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের প্রেক্ষাপটে পোল্যান্ডও নিজস্ব উদ্যোগে সাময়িক এ ধরনের বিধিনিষেধ জারি করেছিল।

দ্বিতীয় বিকল্প হিসেবে ইউরোপের বহিরাগত সীমান্ত সংস্থা ‘ফ্রন্ট্যাক্স’ (Frontex)-এর ক্ষমতা ও আকার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ২০২৪ সালে ভন ডার লিয়েন এই বাহিনীর সদস্য সংখ্যা বাড়িয়ে ৩০ হাজার করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এছাড়া আগামী সাত বছরের বাজেটে ফ্রন্ট্যাক্সের বরাদ্দ দ্বিগুণ করে ১২ বিলিয়ন ইউরো করার পরিকল্পনা রয়েছে। সংস্থাটিকে কেবল সীমান্ত পাহারাই নয়, বরং অবৈধ অভিবাসীদের তৃতীয় কোনো দেশে ফেরত পাঠানো ও প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সরাসরি যুক্ত করার ক্ষমতা দেওয়া হতে পারে।

তৃতীয় বড় পদক্ষেপটি হতে পারে ইউরোপের বাইরে তথাকথিত ‘রিটার্ন হাব’ বা নির্বাসন কেন্দ্র নির্মাণে ইইউর নিজস্ব বাজেট থেকে অর্থায়ন করা। নতুন আইনের আওতায় ইইউ সদস্য রাষ্ট্রগুলো নিজেদের দেশের বাইরে অভিবাসীদের ফেরত পাঠানোর কেন্দ্র স্থাপনের জন্য তৃতীয় দেশগুলোর সাথে চুক্তি করার ক্ষমতা পাচ্ছে। ইতিমধ্যে পাঁচটি ইইউ রাষ্ট্র নাম প্রকাশ না করা কিছু দেশের সাথে ২০২৬ সালের মধ্যে এই প্রক্রিয়া শুরুর লক্ষ্যে আলোচনা অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০২৮-২০৩৪ মেয়াদের বাজেটে অভিবাসন ব্যবস্থাপনার জন্য প্রস্তাবিত ৭৪ বিলিয়ন ইউরোর একটি অংশ দিয়ে এসব কেন্দ্র পরিচালনায় অর্থ দেওয়া হতে পারে।

ইউরোপীয় পার্লামেন্টের বৃহত্তম দল মধ্য-ডানপন্থি ‘ইউরোপিয়ান পিপলস পার্টি’ (ইপিপি) এই তিনটি প্রস্তাবকেই সমর্থন করছে। ডানপন্থি ও কট্টর ডানপন্থিদের সমর্থনে পার্লামেন্টে এসব প্রস্তাব সহজে পাস করিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে বামপন্থি দল ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই কঠোর পদক্ষেপের তীব্র বিরোধিতা করছে। গ্রিনস দলের ইউরোপীয় পার্লামেন্ট সদস্য মেলিসা কামারা সতর্ক করে বলেছেন, ‘এই একই পথে হাঁটা এক মারাত্মক ঐতিহাসিক ভুল হবে।’

শেয়ার
মতামত দিন...

Exit mobile version