যুক্তরাজ্যের ক্রোবোরোর পূর্ব সাসেক্সে (GB Crowborough, East Sussex)- সাধারণত শান্ত, গাছ-গাছালিপূর্ণ, পারিবারিক পরিবেশে পরিচিত একটি শহর।
কিন্তু সম্প্রতি, শহরটিকে আলোচনায় নিয়ে এসেছে সরকারের এক পরিকল্পনা। শহরের বাইরে অবস্থিত একটি সামরিক প্রশিক্ষণ ঘাঁটি ব্যবহার করে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য সাময়িক শিবির গড়ে তোলার প্রস্তাব। সরকারি উদ্যোগ অনুসারে, শিবিরে রাখা হতে পারে প্রায় ৫৪০ থেকে ৬০০ জন একক পুরুষ আশ্রয়প্রার্থী।
বহু বাসিন্দা ও স্থানীয় পরিষদ এই সিদ্ধান্তকে অনিরাপদ, অপ্রস্তুত এবং অসম্পূর্ণ পরিকল্পনা হিসেবে দেখেছেন। তারা বলছেন…
কোথাও মতামত নেওয়া হয়নি, স্থানীয় পরিষেবা, নিরাপত্তা বা প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামোর ওপর এর প্রভাব বিবেচনায় আনা হয়নি।
একাধিক নেতৃত্বাধীন গোষ্ঠী, বিশেষ করে ওয়েলডেন জেলা পরিষদ (Wealden District Council), এক মতবিরোধী প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ইউনানিমাসভাবে ভোট দিয়েছে এবং প্রস্তাব মেনে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে আইনগতভাবে চ্যালেঞ্জ করার প্রস্তুতি নিয়েছে।
এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের রূপ নিয়েছে দ্রুত। ২০২৫ সালের নভেম্বরে, শহরের রাস্তায় সহস্রাধিক মানুষ শান্তিপূর্ণ মিছিল ও বিক্ষোভে যোগ দিয়েছে।
উদাহরণস্বরূপ, এক মিছিলে প্রায় ৬০০ জন প্রতীকী নম্বর ব্যাজ পড়ে অংশ নিয়েছিলেন, যা বোঝাতে চায়, ঠিক এতজনই শিবিরে আসতে পারে।
অন্য এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত সপ্তাহান্তে প্রায় ৩ হাজার জন অংশ নিয়েছে বিক্ষোভে। এসময় বিক্ষোভকারীরা “তাদের দেশে পাঠানো হোক” (Send them home)-সহ বিভিন্ন স্লোগান দিয়েছে।যদিও পুলিশ বলেছে, বিক্ষোভ শান্তিপূর্ণ হয়েছে এবং কোন লোক গ্রেফতার করা হয়নি।
কিছু প্রতিবাদকারী সাউন্ড বক্তৃতা দেন, আবার কেউ কেউ পশ্চিমা পতাকা বা স্থানীয় প্রতীক হাতে রাখেন। এতে স্পষ্ট যে, এই সমস্যার দিকে দেখা হচ্ছে একক অভিবাসীদের সংখ্যায় নয়, বরং সমাজ, নিরাপত্তা ও পরিষেবার ভবিষ্যত নিয়ে।
সরকারের পক্ষ থেকে (বিশেষ করে গৃহমন্ত্রণালয়-Home Office) এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়-Ministry of Defence)- যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, তারা হোটেলে আশ্রয়প্রার্থীরা রাখার সিদ্ধান্ত ধাপে ধাপে বন্ধ করতে চায়। এবং হোটেলগুলোতে থাকা বহু অভিবাসীকে সাময়িক নয়, বরং নিরাপদভাবে এবং সংরক্ষিতভাবে এমন কোনো জায়গায় রাখতে চায়, যেগুলো হোটেলে অপেক্ষার চাইতে উপযুক্ত।
তবে সরকারের ভাষ্য…
এই শিবির চালুর পরিকল্পনা অনুযায়ী ক্রোবোরো (Crowborough)–র ঘাঁটিটি মেরামত বা সংরক্ষণের কাজ করতে হবে, যা সযত্নে করা হচ্ছে।
এদিকে, স্থানীয়দের ভয় যদি ৬০০ অজ্ঞাত পরিচয় পুরুষ একসঙ্গে আসে তাহলে নিরাপত্তা, সামাজিক সংহতি ও জনসাধারণের ব্যবস্থাপনায় চাপ পড়বে। একইসাথে এখন উদ্বেগের কারণ হলো, এতে পরিষেবা, আবাসন, স্বাস্থ্য, বিদ্যালয়-শিক্ষা, সামাজিক সংহতিতেও চাপ বাড়বে। আরেকটি বড় বিষয় হলো অনেক স্থানীয় বাসিন্দা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে তাঁদের প্রয়োজনীয় মতামত বা পরামর্শই নেয়া হয়নি।
বর্তমান সময়ে, ইউকে-তে হোটেল ভিত্তিক আশ্রয়প্রার্থীদের অস্থায়ী থাকার প্রথা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। সরকার চায় সে প্রথা বন্ধ করে দিক। ক্রোবোরো (Crowborough)–র মতো জায়গাগুলোকে নতুন “স্থায়ী” অপশন হিসেবে দেখা হচ্ছে। কিন্তু এই প্রস্তাব সামাজিক সম্মতি ও পর্যাপ্ত পরিকল্পনার সঙ্গে না হলে, তা জনমনে ভীতি, বিভাজন এবং সম্ভাব্য সামাজিক উত্তেজনা তৈরি করতে পারে। ক্রোবোরো (Crowborough)–র ঘটনা এখন প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে, গ্রামীণ বা ছোট-শহরগুলো, যেখানে জনসংখ্যা কম, কিন্তু স্থিতিশীল সামাজিক কাঠামো রয়েছে, সেখানে আকস্মিক অভিবাসী ঢেউ লাগলে কী হবে, অনেকেই এই প্রশ্নও তুলেছে।
ক্রোবোরো (Crowborough)- এক সময় যাকে শান্ত, সবুজ, পারিবারিক শহর বলা হতো, আজ হলো অভিবাসন, আশ্রয়প্রার্থী ও সমাজ পরিবর্তন নিয়ে তুমুল বিতর্ক ও প্রতিক্রিয়ার কেন্দ্র।
সরকারের পরিকল্পনা, যাতে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য সামরিক ঘাঁটিতে শিবির তৈরি করা হচ্ছে, স্থানীয়রা স্বাগত জানায়নি। তারা জানিয়েছেন, এমন সিদ্ধান্তে আগে থেকে পরামর্শ, নিরাপত্তা পরিকল্পনা, সামাজিক প্রস্তুতি ও পরিষেবা ব্যবস্থাপনা সবই ছিলো না।
ক্রোবোরো (Crowborough)-র বিক্ষোভ, শান্তিপূর্ণভাবে হলেও, স্পষ্ট করে দিয়েছে সাধারণ নাগরিকদের ভয়, সংশয় ও প্রতিবাদের অনুভূতি সব সময় গুরুত্ব পেতে হবে। এই ইস্যু ভবিষ্যতে কীভাবে এগোবে, সমাজ, সরকার এবং আশ্রয়প্রার্থীদের মধ্যে অর্থ, নিরাপত্তা ও সামাজিক সমন্বয় কতটা সম্ভব হবে, সেটা সময় এবং যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতি-পরিবর্তনসহ সমগ্র প্রেক্ষাপটে দেখতে হব।।
