চলতি মাসের শেষ দিকে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ অভিবাসন ও আশ্রয়প্রদান সংক্রান্ত নতুন আইনের ঘোষণা দিতে যাচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছে, এই আইন হবে ইউরোপের সবচেয়ে কঠোর অভিবাসননীতি ডেনমার্কের আদলে তৈরি, যেখানে অভিবাসীদের জন্য প্রণোদনা কমানো, প্রত্যাবাসন সহজ করা এবং পারিবারিক পুনর্মিলনে কঠোর শর্ত আরোপের মতো বিধান থাকতে পারে।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ জানিয়েছেন, ডেনমার্কের অভিবাসন আইনের বাস্তব অভিজ্ঞতা জানতে ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি প্রতিনিধি দল সম্প্রতি কোপেনহেগেন সফর করেছে। তিনি বলেন…
ডেনমার্ক যেভাবে গত ৪০ বছরে আশ্রয় আবেদন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে এনেছে, তা অনুপ্রেরণাদায়ক। আমরা সেখান থেকে অনেক কিছু শিখতে চাই।
মাহমুদ আরও জানান, নতুন আইনে পারিবারিক পুনর্মিলন, শরণার্থীদের অস্থায়ী সুরক্ষা, এবং স্থায়ী বসবাসের জন্য কর্মসংস্থানের শর্ত যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ডেনমার্কে বর্তমানে শরণার্থীদের আশ্রয় নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময় শেষে যদি সরকার সংশ্লিষ্ট দেশকে নিরাপদ ঘোষণা করে, তবে তাদের দেশে ফেরত পাঠানো হয়, এমনকি যদি তারা স্বেচ্ছায় নাও যেতে চায়।
উদাহরণস্বরূপ, সিরীয় শরণার্থীদের ফেরত পাঠানোর বিষয়ে নতুন পরিকল্পনা নিচ্ছে ড্যানিশ সরকার, কারণ তারা মনে করছে সিরিয়ার যুদ্ধ এখন নিরাপদ অবস্থায় আছে। যুক্তরাজ্যও এমন পদক্ষেপ বিবেচনা করছে, যেখানে স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পেতে হলে শরণার্থীদের পূর্ণকালীন চাকরি থাকা বাধ্যতামূলক হতে পারে।
পারিবারিক পুনর্মিলনে নতুন নিয়ম
ব্রিটিশ প্রশাসন ডেনমার্কের পারিবারিক পুনর্মিলন আইনের মডেল অনুসরণে বিশেষভাবে আগ্রহী। ডেনমার্কে আশ্রয়প্রাপ্ত কেউ বিয়ে করতে চাইলে তার বয়স হতে হবে অন্তত ২৪ বছর। দম্পতির একজন যদি অন্য দেশে থাকেন, তবে ডেনমার্কে অবস্থানকারী ব্যক্তিকে বিয়ের আগের তিন বছর সরকারের কোনো আর্থিক সহায়তা না নেওয়ার প্রমাণ দিতে হয়। বিয়ের সনদ পাওয়ার জন্য উভয়কেই ড্যানিশ ভাষায় দক্ষতা প্রমাণ করতে হয়। এই ধারা যুক্তরাজ্যও বিবেচনা করছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন শাবানা মাহমুদ।
দেশে ফেরাতে প্রণোদনা ও প্রত্যাবাসন কর্মসূচি
ডেনমার্ক আশ্রয়প্রার্থীদের দেশে ফেরত যাওয়ার জন্য ২৭ হাজার ইউরো পর্যন্ত অর্থনৈতিক প্রণোদনা দিচ্ছে। ৯৫ শতাংশ আশ্রয় আবেদন বাতিল হওয়া ব্যক্তিকেই ইতিমধ্যে দেশে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হয়েছে দেশটি। তবে যুক্তরাজ্য এই ধরনের প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই পরিকল্পনা নিয়ে সমালোচনায় মুখর হয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও মানবাধিকার সংগঠন। এমনকি তার নিজ দল লেবার পার্টির কয়েকজন সংসদ সদস্যও এই উদ্যোগকে অত্যন্ত কঠোর ও দক্ষিণপন্থি বলে আখ্যা দিয়েছেন।
লেবার সাংসদ ক্লিভ লিউস বিবিসিকে বলেন…
ডেনমার্কের আইন অনেক বেশি শক্ত। তারা এমন কিছু গ্রহণ করেছে যা দক্ষিণপন্থি নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। বামপন্থি দলগুলো মনে করছে, সরকার মূলত রিফর্ম ইউকে ও কনজারভেটিভদের চাপের মুখে অভিবাসন ইস্যুতে এমন অবস্থান নিচ্ছে।
ব্রিটেন কি পারবে ডেনমার্কের মতো আইন প্রয়োগ করতে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, ব্রিটেনের জন্য ডেনমার্কের অভিবাসন মডেল হুবহু অনুসরণ করা কঠিন হবে, কারণ যুক্তরাজ্যের জনসংখ্যা ডেনমার্কের চেয়ে ১১ গুণ বেশি। ইংরেজি একটি বৈশ্বিক ভাষা হওয়ায় ভাষা-নির্ভর শর্ত এখানে অকার্যকর হতে পারে। ডেনমার্কে নৌকাযোগে অভিবাসন খুব কম হয়, কিন্তু যুক্তরাজ্যে “ইংলিশ চ্যানেল ক্রসিং” এখন বড় চ্যালেঞ্জ। তাই কঠোর পারিবারিক পুনর্মিলন বা ভাষাগত শর্তের মতো বিধান অভিবাসীদের সংখ্যা কমাতে তেমন প্রভাব ফেলবে না বলে মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ।
ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে আসা অভিবাসীদের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে, এ বছরই প্রায় ৩৮ হাজারের বেশি মানুষ এই পথ পাড়ি দিয়েছেন। এই বাস্তবতায় যুক্তরাজ্য নতুন আইন প্রণয়নে তৎপর হয়েছে। তবে প্রশ্ন রয়ে গেছে,
ডেনমার্কের মতো কঠোর আইন কি ব্রিটেনের বহুজাতিক সমাজে কার্যকর হবে, নাকি তা নতুন বিতর্কের জন্ম দেবে?
