যুক্তরাজ্যে কোনো কর্মঘণ্টার নিশ্চয়তা ছাড়া কাজ করানোর বিতর্কিত ‘জিরো-আওয়ার চুক্তি’ নিষিদ্ধ করার বিষয়ে মন্ত্রীদের বিস্তারিত পরিকল্পনা এক নজিরবিহীন সমালোচনার মুখে পড়েছে। সরকার এই প্রথা বন্ধ করে কর্মীদের প্রচলিত কর্মঘণ্টার ভিত্তিতে সপ্তাহে ন্যূনতম ৮ থেকে ২০ ঘণ্টা নিশ্চিত কাজের সুযোগ দিতে চায়। কিন্তু নতুন এই প্রস্তাবিত নীতিমালার জেরে শ্রমিক ইউনিয়ন ও ব্যবসায়ী সংগঠন বা নিয়োগকর্তা উভয় পক্ষই সরকারের ওপর চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। জিরো-আওয়ার নিষেধাজ্ঞা কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, তা নিয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এই রূপরেখা তুলে ধরা হয়।
লেবার পার্টির ঐতিহাসিক ‘এমপ্লয়মেন্ট রাইটস অ্যাক্ট’-এর অংশ হিসেবে আগামী বছর থেকে এই নতুন নিয়ম কার্যকর হতে যাচ্ছে। নতুন আইন অনুযায়ী, এজেন্সি কর্মীসহ সব ধরনের কর্মীকে তাদের নিয়মিত কাজের ওপর ভিত্তি করে প্রতি সপ্তাহে একটি নির্দিষ্ট ন্যূনতম ঘণ্টা মেয়াদের চুক্তি দিতে হবে। সরকারের পছন্দের বিকল্প অনুযায়ী, গত ১২ সপ্তাহের কাজের গড় হিসাব করে একজন কর্মীর নিয়মিত কর্মঘণ্টা নির্ধারণ করা হবে। নতুন নিয়মে কর্মীরা চাইলে নিজেদের ইচ্ছায় জিরো-আওয়ার চুক্তি বেছে নিতে পারবেন, তবে স্বল্প সময়ের নোটিশে তাদের শিফট পরিবর্তন বা বাতিল করা হলে তারা আর্থিক ক্ষতিপূরণ পাওয়ার যোগ্য হবেন। যুক্তরাজ্যের পাব, রেস্তোরাঁ, গুদাম ও হাসপাতালের মতো খাতগুলোতে বর্তমানে ১০ লক্ষাধিক মানুষ কোনো কর্মঘণ্টার নিশ্চয়তা ছাড়াই এই জিরো-আওয়ার চুক্তিতে কাজ করছেন।
যুক্তরাজ্যের বাণিজ্য সচিব পিটার কাইল এই পরিবর্তনের পক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, নিয়মিত কাজ করার পরও প্রতি সপ্তাহে বেতন নিয়ে কোনো নিশ্চয়তা না থাকাটা অন্যায্য। এই সংস্কার সর্বনিম্ন বেতনভোগী কর্মীদের শত শত পাউন্ড সাশ্রয় করবে এবং জীবনে আর্থিক নিরাপত্তা এনে দেবে। তবে সরকারের এই আশ্বাসে মোটেও সন্তুষ্ট নয় শ্রমিক ইউনিয়নগুলো। তারা সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘণ্টা কাজের নিশ্চয়তা দেওয়ার সরকারি সীমাবদ্ধতায় গভীর হতাশা প্রকাশ করেছে; কারণ জিরো-আওয়ারে থাকা অনেক কর্মী বর্তমানে এর চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি সময় কাজ করেন। দোকানশ্রমিকদের ইউনিয়ন ‘ইউএসডিএডাব্লিউ’ (Usdaw) এবং ট্রেডস ইউনিয়ন কংগ্রেস (টিইউসি) সতর্ক করেছে যে, এই নিয়মের ফলে তরুণ, নারী ও সংখ্যালঘুরা অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন এবং অসৎ নিয়োগকর্তাদের খামখেয়ালিপনার কারণে শ্রমিকরা দীর্ঘস্থায়ী চাকরি অনিশ্চয়তার সম্মুখীন হতে পারেন।
অন্যদিকে, নিয়োগকর্তা ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠীগুলো এই অতিরিক্ত বিধি-নিষেধের কারণে উল্টো চাকরির বাজার সংকুচিত হওয়ার এবং তরুণদের কর্মসংস্থান সংকটে পড়ার তীব্র আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। হাজার হাজার রেস্তোরাঁ ও হোটেলের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থা ‘ইউকে হসপিটালিটি’ এবং খুচরা বিক্রেতাদের সংগঠন ‘ব্রিটিশ রিটেইল কনসোর্টিয়াম’ (বিআরসি) জানিয়েছে, ১২ সপ্তাহের হিসাবের কারণে বড়দিনের মতো ব্যস্ত মৌসুমে খণ্ডকালীন কর্মী নিয়োগ দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়বে। তারা ১২ সপ্তাহের বদলে ২৬ সপ্তাহের গড় সময়সীমা নির্ধারণ এবং শিফট পরিবর্তনের নোটিশের সময় কমানোর দাবি জানিয়েছে। ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, ভালো নিয়োগকর্তাদের ওপর অতিরিক্ত নিয়মকানুনের বোঝা চাপালে তা শেষ পর্যন্ত কর্মসংস্থান তৈরির গতিকেই সম্পূর্ণ থামিয়ে দেবে।
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
