পর্তুগালের নতুন একক সামাজিক সুবিধা ‘পিএসইউ’ চালুর পথ আবারও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। মাত্র এক সপ্তাহ আগে যে আইনের প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছিল প্রধান বিরোধী দল সোশ্যালিস্ট পার্টি (পিএস), তা নিয়ে এখন নতুন করে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে তারা।
গত ৩০ জুলাই (বৃহস্পতিবার) মন্ত্রিপরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত ‘প্রেস্তাসাঁও সোসিয়াল ইউনিক’ (পিএসইউ) বা একক সামাজিক সুবিধার বেশ কয়েকটি বিষয়ে সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে চিঠি পাঠিয়েছে পিএস। একই সঙ্গে তারা এই ডিক্রি-আইনটি পর্যালোচনার জন্য পার্লামেন্টে পাঠানোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিচ্ছে না।
এই প্রক্রিয়ায় যেকোনো ধরনের বিলম্বের বড় ধরনের আর্থিক পরিণতি হতে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের পিআরআর পুনরুদ্ধার তহবিল থেকে ৬০ কোটি ইউরো পাওয়ার শর্ত পূরণ করতে হলে পর্তুগালকে চলতি মাসের মধ্যেই এই সামাজিক সংস্কার বিলটি কার্যকর করতে হবে।
পিএস-এর এই নতুন অবস্থানটি এমন এক সময়ে এল, যখন গত ২৪ জুলাই তারা পিএসডি-নেতৃত্বাধীন সরকারের সাথে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর ঘোষণা দিয়েছিল। সে সময় তারা বলেছিল, এই সমঝোতা ‘সামাজিক সংহতি, মানুষের মর্যাদা এবং অন্তর্ভুক্তি রক্ষা করবে’।
তবে পর্তুগালের সংবাদপত্র ‘পাবলিকো’-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমাজতন্ত্রী দলটির আশঙ্কা—সরকার কর্তৃক অনুমোদিত ডিক্রি-আইনের কিছু দিক বেশ কিছু সুবিধাভোগীকে আরও বেশি আর্থিক সংকটে ফেলতে পারে।
তাদের উদ্বেগের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে পিএসইউ-এর রেফারেন্স বা ভিত্তি মূল্য ২৬৮.৬০ ইউরো, যা পর্তুগালের সামাজিক সহায়তা সূচকের (আইএএস) ৫০ শতাংশের সমান। প্রস্তাবিত হিসাবের নিয়ম এবং যোগ্যতা ও অর্থ প্রদানের ক্ষেত্রে এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পিএস।
দলটির আশঙ্কা, এই নতুন ব্যবস্থার অধীনে বর্তমানে যারা সামাজিক বেকারত্ব সুবিধা, সামাজিক পিতৃত্ব/মাতৃত্ব সুবিধা বা সামাজিক পেনশন পাচ্ছেন, তাদের ভাতার পরিমাণ হ্রাস পেতে পারে।
এ ছাড়া আবাসন সহায়তার হিসাব কীভাবে করা হবে, অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের নিয়মগুলো এবং সুবিধাভোগীদের পর্যবেক্ষণ ও তদারকির জন্য স্থানীয় কাউন্সিলগুলোকে দেওয়া দায়িত্বের বিষয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
পিএস আইনের এমন কিছু ধারা থেকে অস্পষ্টতা দূর করার দাবি জানিয়েছে, যা পিএসইউ সুবিধাভোগীদের জন্য সামাজিক কল্যাণমূলক কাজে অংশ নেওয়াকে একটি সার্বজনীন বাধ্যবাধকতা হিসেবে ব্যাখ্যা করতে পারে।
বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল, কারণ এর আগে সরকারের সাথে সমঝোতার সময় দলটি নিশ্চিত করেছিল যে এ ধরনের কাজ বাধ্যতামূলক হবে না। এ ছাড়া তারা ‘দরিদ্র মানুষের ওপর দরিদ্র মানুষের গোয়েন্দাগিরি’কে উৎসাহিত করার মতো একটি বিতর্কিত অভিযোগ বা অভিযোগের চ্যানেল বাতিল করার দাবিও জানিয়েছিল।
উদ্বেগের আরেকটি বড় ক্ষেত্র হলো ঝুঁকিতে থাকা শিশুরা। ডিক্রি-আইনে সুনির্দিষ্টভাবে কেবল অনাথ বা এতিম অপ্রাপ্তব্যয়স্কদের কথা বলা হয়েছে। ফলে এতিম নয় কিন্তু অত্যন্ত দরিদ্র ও সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকা অন্য শিশুরা এই সামাজিক সুবিধার বাইরে থেকে যেতে পারে।
যদিও বর্তমানে পার্লামেন্টের গ্রীষ্মকালীন ছুটি চলছে, তবুও পিএস এই ডিক্রি-আইনের ওপর সংসদীয় পর্যালোচনার দাবি জানাতে পারে এবং এমপিরা ফিরে আসার পর সংশোধনের প্রস্তাব করতে পারে। তবে সে ক্ষেত্রে পর্তুগাল ৬০ কোটি ইউরোর ইউরোপীয় তহবিল হারাবে, কারণ পিএসইউ কার্যকর করার চূড়ান্ত সময়সীমা আগামী ৩১ আগস্ট।
ইতিমধ্যে পর্তুগালের অন্যতম প্রধান ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশন ‘সিজিটিপি’ এই সংস্কার বিলের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ চালিয়েছে। তাদের দাবি, এই বিলের কিছু ধারা সমতা, কাজের অধিকার এবং সামাজিক নিরাপত্তার মৌলিক নীতিগুলোকে লঙ্ঘন করে।
ইউনিয়নটির মতে, পিএসইউ ব্যবস্থাটি আগে থেকে চলে আসা সামাজিক ভাতার তুলনায় কোনোভাবেই সুবিধাজনক নয়, তা যোগ্যতার শর্তেই হোক কিংবা অর্থ প্রদানের পরিমাণের দিক থেকেই হোক।
সুবিধাভোগীদের বিনাবেতনে কাজ করার বাধ্যবাধকতা রাখার তীব্র সমালোচনা করে সিজিটিপি এই প্রস্তাবটিকে ‘জোরপূর্বক শ্রমের সংজ্ঞার সাথে অনেক সাদৃশ্যপূর্ণ’ বলে বর্ণনা করেছে।
তারা যুক্তি দেয়, বিভিন্ন সংস্থাকে এ ধরনের অবৈতনিক কর্মী সরবরাহ করার সিদ্ধান্ত শ্রমবাজারকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে, কারণ এর ফলে সংশ্লিষ্ট কাজগুলোতে বেতনভুক্ত কর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে নিয়োগকর্তাদের আগ্রহ কমে যাবে।
সরকারের দাবি, ২৬৮.৬০ ইউরোর এই রেফারেন্স বা ভিত্তি মূল্যটি বর্তমানে চালু থাকা সামাজিক একীকরণ আয়ের (আরএসআই) চেয়ে ৮.৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে সিজিটিপির মতে, এই পরিমাণটি পর্তুগালের মাসিক দারিদ্র্যসীমা ৭২৩ ইউরোর চেয়ে অনেক নিচে এবং এটি অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল মানুষের মর্যাদার সাথে বেঁচে থাকার কোনো নিশ্চয়তা দেয় না।
প্রস্তাবিত পিএসইউ ব্যবস্থাটি মূলত বিদ্যমান কয়েকটি সামাজিক ভাতাকে একত্রিত করে একটি একক ব্যবস্থার অধীনে নিয়ে আসবে। সরকারের প্রত্যাশা, এর ফলে সরকারি ব্যয়ে বছরে প্রায় ৫ কোটি ইউরো অতিরিক্ত যুক্ত হবে, যা বর্তমান ভাতার খরচের চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ বেশি।
এই ডিক্রি-আইনটি গত জুন মাসে পার্লামেন্ট কর্তৃক অনুমোদিত আইনি কর্তৃত্বের ভিত্তিতে এবং ১৭ জুলাই প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষরের পর বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। তবে নতুন এই সংশয়গুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, রাজনৈতিক সমঝোতা হলেও এই নতুন সামাজিক কল্যাণ ব্যবস্থাটির ভবিষ্যৎ এখনও অনিশ্চিত।


