পর্তুগালের সরকারি পেনশন ব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ কমাতে এবং অবসরপ্রাপ্তদের আর্থিক নিরাপত্তা জোরদার করতে কর্মীদের জন্য স্বয়ংক্রিয় কর্মক্ষেত্র পেনশন স্কিম চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
পর্তুগালের রাষ্ট্রীয় সামাজিক নিরাপত্তা ও পেনশন ব্যবস্থা—‘সেগুরাঞ্চা সোশিয়াল’-এর দীর্ঘমেয়াদী স্থায়িত্ব পর্যালোচনার জন্য সরকার মনোনীত একটি বিশেষজ্ঞ দল গত ১৮ মাসের গবেষণা শেষে মঙ্গলবার তাদের চূড়ান্ত সুপারিশমালা পেশ করেছে।
এই দলটির প্রধান সুপারিশগুলোর একটি হলো স্বয়ংক্রিয় কর্মক্ষেত্র পেনশন ব্যবস্থা, যা সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের কর্মীদের জন্য প্রযোজ্য হবে। নতুন নিয়মে কোনো কর্মী চাকরিতে যোগ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি অবসরকালীন সঞ্চয় পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবেন। তবে এই প্রকল্পে অংশগ্রহণ বাধ্যতামূলক নয়; যেকোনো কর্মী চাইলে এই স্কিম থেকে নিজেকে প্রত্যাহার (opt out) করে নেওয়ার অধিকার রাখবেন।
বিশেষজ্ঞ দলের সমন্বয়ক জর্জ ব্রাভো জোর দিয়ে বলেছেন, এই অতিরিক্ত পেনশন ব্যবস্থা পর্তুগালের বিদ্যমান সরকারি পেনশন ব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করবে না, বরং তার পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে। প্রস্তাবিত নিয়মে মোট বেতনের ৮ থেকে ১০ শতাংশ অর্থ সঞ্চয় হিসেবে জমা হতে পারে, যা ধাপে ধাপে চালু হবে এবং এর খরচ কর্মী, নিয়োগকর্তা ও রাষ্ট্র যৌথভাবে বহন করবে। ইউরোপের অন্যান্য দেশে ইতিমধ্যেই এ ধরনের পরিপূরক পেনশন ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা শিশু ও তরুণদের জন্যও ব্যক্তিগত অবসরকালীন সঞ্চয় হিসাব (সেভিংস অ্যাকাউন্ট) খোলার প্রস্তাব করেছেন। ‘গ্রাও আ গ্রাও’ নামের এই প্রস্তাবিত কর্মসূচির আওতায় পর্তুগালে বসবাসরত এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিবন্ধিত শিশুরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি সঞ্চয় হিসাব এবং সরকারি অনুদান পাবে। পরবর্তীতে পরিবার বা শুভাকাঙ্ক্ষীরাও সেই অ্যাকাউন্টে টাকা জমা করতে পারবেন। এই স্কিমের লক্ষ্য হলো খুব ছোটবেলা থেকেই অবসরকালীন সম্পদ গড়ে তোলা এবং আর্থিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা।
এছাড়া অন্যান্য প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে পর্তুগিজ সরকারি বন্ডের সঙ্গে যুক্ত নতুন অবসরকালীন স্কিম চালু করা, যার মাধ্যমে দৈনন্দিন কেনাকাটার খুচরা টাকাও সঞ্চয়ে রূপান্তর করা যাবে। পাশাপাশি বয়োবৃদ্ধ বাড়ির মালিকেরা যাতে তাঁদের সম্পত্তি ব্যবহার করে অবসরকালীন আয় নিশ্চিত করতে পারেন, সে ধরনের সুযোগ রাখার কথাও বলা হয়েছে।
পেনশন তহবিলের প্রকৃত চিত্র নিয়ে বিতর্ক
পর্তুগালের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বর্তমান ইতিবাচক আর্থিক চিত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে এই প্রতিবেদন। পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যম ইসিও-এর তথ্য অনুযায়ী, বিশেষজ্ঞরা যুক্তি দিয়েছেন যে কেবল সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলের হিসাব দেখলে প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে না। কারণ এর মধ্যে ‘কাইশা জেরাল দে আপোজেন্তাসোয়েস’ (CGA) বা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ঐতিহ্যগতভাবে ব্যবহৃত পৃথক পেনশন ব্যবস্থার হিসাবটি বাদ দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, এই দুটি ব্যবস্থার ভারসাম্য একত্র করলে ২০২৫ সালে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে উদ্বৃত্ত থাকার পরিবর্তে প্রায় ১৯৪ কোটি (১.৯৪ বিলিয়ন) ইউরোর ঘাটতি দেখা দিত।
তবে এই বিশ্লেষণটি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্প্রতি বড় ধরনের উদ্বৃত্ত রেকর্ড করেছে এবং সমালোচকদের মতে সিজিএ-এর হিসাবকে এর সঙ্গে যুক্ত করা উচিত নয়। তা সত্ত্বেও পূর্ববর্তী সরকারি পূর্বাভাসগুলো পেনশন ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদী জনসংখ্যাগত (ডেমোগ্রাফিক) চাপের ইঙ্গিত দিয়েছিল।
প্রধান বিরোধী দল সোশ্যালিস্ট পার্টি এই বিশেষজ্ঞ দলের কাজের রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তবে অর্থনীতিবিদ জর্জ ব্রাভো এই রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং স্পষ্ট করেছেন যে এই প্রস্তাবগুলো পর্তুগালের বিদ্যমান পেনশন ব্যবস্থাকে বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার বা প্রাইভেটাইজ করার কোনো চেষ্টা নয়।
সরকার ইতিমধ্যে ইঙ্গিত দিয়েছে যে বর্তমান মেয়াদে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার বড় ধরনের কাঠামোগত সংস্কারের কোনো পরিকল্পনা নেই, তবে পরিপূরক পেনশন ব্যবস্থাগুলোর কার্যকারিতা খতিয়ে দেখতে তারা প্রস্তুত।


