ইহুদিদের সবচেয়ে পবিত্র দিন ‘ইয়োম কিপুর’-এ যুক্তরাজ্যের ম্যানচেস্টারের ইহুদি সম্প্রদায়ের ওপর সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনার অভিযোগে দুই ইরানি অভিবাসীকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে একজন এর আগে জার্মানিতেও রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছিলেন বলে আদালতে জানানো হয়েছে।
গত ২০ সেপ্টেম্বর ইয়োম কিপুরের আগের দিন ম্যানচেস্টার থেকে কাউন্টার টেররিজম পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন ৩৬ বছর বয়সী সালাম আহমাদিয়ান এবং ৩৪ বছর বয়সী রহমান সালেহি। ছোট নৌকায় করে অবৈধভাবে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করা এই দুই ব্যক্তিকে শনিবার সকালে ওয়েস্টমিনস্টার ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে হাজির করা হয় এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের প্রস্তুতি গ্রহণের অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হয়। আদালতে আরও জানানো হয় যে সেলফোর্ড ও লিভারপুলে বসবাসকারী এই দুই সন্দেহভাজন ইরানে অবস্থানকারী তৃতীয় এক পক্ষের সঙ্গে এই হামলার ষড়যন্ত্র নিয়ে যোগাযোগ করছিলেন।
গত বছর হিটন পার্ক সিনাগগে সন্ত্রাসী হামলায় দুই উপাসনাকারী নিহতের ঘটনার প্রথম বার্ষিকীর দিনেই এই হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়।
আদালতকে জানানো হয়, সালেহি জার্মানিতে পাঁচ বছর কাটিয়ে সেখানে আশ্রয়ের আবেদন করার পর ২০২০ সালে ছোট নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে আসেন। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে যুক্তরাজ্যে তাঁকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হয় এবং ২০২৮ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশটিতে তাঁর থাকার বৈধ অনুমতি রয়েছে। অন্যদিকে আহমাদিয়ান ২০২৩ সালে ছোট নৌকায় চেপে যুক্তরাজ্যে আসেন এবং তাঁর আশ্রয়ের আবেদনটি এখনও বিচারাধীন রয়েছে।
আহমাদিয়ান এবং সালেহি কারাগারের ধূসর রঙের সোয়েটশার্ট ও ট্র্যাকস্যুট পরে কাঠগড়ায় হাজির হন। সেখানে তাঁরা কেবল নিজেদের নাম, বয়স ও ঠিকানা নিশ্চিত করতে কথা বলেন।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, ২০২৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বা তার আগে আহমাদিয়ান ও সালেহি হাতে তৈরি বিস্ফোরক সরঞ্জাম সংগ্রহের জন্য এনক্রিপ্ট করা অ্যাপ ব্যবহার করে অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। এ ছাড়া তাঁরা ‘পাউডার ক্লোরিন এবং গাড়ির ব্রেক ফ্লুইড বোমা তৈরির ধাপসমূহ’ শীর্ষক একটি নথি সংগ্রহ করেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়, তাঁরা দেশীয় বিস্ফোরক ডিভাইস তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় তরল ও যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করেছিলেন; হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু অনুসন্ধানে ইন্টারনেট ব্যবহার করেছিলেন; সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর ছবি, পরিকল্পনা ও মানচিত্র সংগ্রহ করেছিলেন এবং হামলার লক্ষ্যে ইহুদি সম্প্রদায়ের বিভিন্ন এলাকা রেকি বা পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। আদালতকে জানানো হয়, এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল হিটন পার্ক সিনাগগ, ম্যানচেস্টারের ইহুদি জাদুঘর এবং সেলফোর্ডের একটি ইহুদি বিদ্যালয়।
ম্যানচেস্টারের নিউটন স্ট্রিট থেকে এই দুজনকে গ্রেপ্তারের পর লন্ডনের একটি পুলিশ স্টেশনে নেওয়া হয়। তদন্তের অংশ হিসেবে লিভারপুলের এপওয়ার্থ স্ট্রিট এবং সেলফোর্ডের ল্যাঙ্কাস্টার রোডের ঠিকানায় তল্লাশি চালানো হয়েছে বলে আদালতকে জানানো হয়।
দুই আসামির বিরুদ্ধে আনা ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে ধরে প্রসিকিউটর মার্ক লাকেট আদালতকে বলেন, ‘তারা এমন এক তৃতীয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগে ছিল, যে তাদের হাতে তৈরি ডিভাইস কীভাবে বানাতে হয় সে সম্পর্কে তথ্য সরবরাহ করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওই ব্যক্তিও একজন ইরানি নাগরিক এবং তিনি ইরানের অভ্যন্তর থেকে কার্যক্রম চালাচ্ছেন।’
২০ মিনিটের শুনানি শেষে জেলা জজ নিনা টেম্পিয়া আসামিদের জামিন না দিয়ে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন এবং আগামী ২৩ অক্টোবর তাঁদের লন্ডনের কেন্দ্রীয় অপরাধ আদালত ‘ওল্ড বেইলি’তে হাজির করার দিন ধার্য করেন।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ নিশ্চিত করেছেন যে অভিযুক্ত দুই ব্যক্তিই ছোট নৌকায় করে ব্রিটেনে এসেছিলেন। তিনি বলেন, দেশটি ‘ইরানি শাসকগোষ্ঠীর গুরুতর হুমকির’ মুখে রয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, ‘সন্দেহভাজন দুজনই কয়েক বছর আগে ছোট নৌকায় করে আসার বিষয়টি আমাদের দেশে অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলার ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রমের গুরুত্ব মনে করিয়ে দেয়। ম্যানচেস্টারের ইহুদি সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী হামলার পরিকল্পনার অভিযোগে দুই সন্দেহভাজনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। রোশ হাশানাহ ও ইয়োম কিপুরের মতো ধর্মীয় উৎসবের পরপরই আসা এই খবরটি আমাদের ইহুদি সম্প্রদায়ের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক হবে। আমি জানি ম্যানচেস্টারের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে সত্যি, কারণ সেখানে হিটন পার্ক সিনাগগে সন্ত্রাসী হামলার এক বছর পূর্ণ হচ্ছে।’
সরকারের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই ফৌজদারি বিচারিক কার্যক্রম গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং আদালতের কার্যক্রম শেষ হলে অভিবাসন সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
কাউন্টার টেররিজম পুলিশের (সিটিপি) সিনিয়র ন্যাশনাল কোঅর্ডিনেটর ও ডেপুটি অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার ভিকি ইভান্স বলেন, ‘এগুলো অত্যন্ত গুরুতর অভিযোগ এবং নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সঙ্গে সিটিপির যৌথ তদন্তের ফলেই এই অগ্রগতি এসেছে। এই তদন্তের মাধ্যমে ম্যানচেস্টারের ইহুদি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে তৈরি করা একটি ষড়যন্ত্র ভণ্ডুল করে দেওয়া সম্ভব হয়েছে বলে আমরা বিশ্বাস করি। আমি আশ্বস্ত করতে চাই যে এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে জনসাধারণের জন্য তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি নেই, তবে সবাইকে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানাচ্ছি।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘এই ঘটনাটি ইরান থেকে যুক্তরাজ্যের প্রতি আসা বৃহত্তর হুমকির বিষয়টিকেও সামনে এনেছে। যদিও এই ঘটনার সঙ্গে আরএএফ ফেয়ারফোর্ড সংক্রান্ত তদন্তের কোনো সংযোগ নেই, তবুও যেকোনো বৈরী কর্মকাণ্ড থেকে যুক্তরাজ্যকে রক্ষা করতে জাতীয় নিরাপত্তা অংশীদারদের সঙ্গে মিলে সিটিপি তাদের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করছে।’
গ্রেটার ম্যানচেস্টার পুলিশের ডেপুটি চিফ কনস্টেবল টেরি উডস বলেন, ‘বৃহত্তর ম্যানচেস্টারসহ এর বাইরের ইহুদি সম্প্রদায়ের কাছে এই খবরটি কতটা উদ্বেগজনক হবে তা আমরা বুঝতে পারছি। আমরা স্থানীয়ভাবে কমিউনিটি নেতাদের সঙ্গে একযোগে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি এবং লন্ডন কাউন্টার টেররিজম পুলিশের সঙ্গেও সার্বক্ষণিক সমন্বয় রয়েছে। ইহুদি এলাকাগুলোতে আমাদের কঠোর নিরাপত্তা পরিকল্পনা এবং পুলিশের দৃশ্যমান উপস্থিতি বজায় থাকবে।’


