চলতি সপ্তাহে ইউরোপে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ন্যাটোর বাল্টিক সদস্যদেশগুলোর সঙ্গে জোটের মূল ভূখণ্ডের একমাত্র স্থল সংযোগ সুওয়ালকি করিডোরের কাছে বড় ধরনের সামরিক মহড়া চালিয়েছে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্র বেলারুশ। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই এলাকাকে দীর্ঘদিন ধরেই ন্যাটোর অন্যতম দুর্বল অবস্থান হিসেবে বিবেচনা করা হয়। খবর সিএনএনের।
পরিস্থিতি নিয়ে ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ দেশটির রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেছেন। বৈঠকের পর রাশিয়ার কথিত হাইব্রিড হামলা থেকে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো রক্ষায় নতুন পদক্ষেপ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স।
আরও কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক। তার আশঙ্কা, ন্যাটোর কোনো সদস্যদেশে ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে সেটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করতে পারে রাশিয়া।
যুক্তরাজ্যও সম্ভাব্য যুদ্ধ পরিস্থিতির জন্য নাগরিকদের প্রস্তুত হতে বলেছে। দেশটির পক্ষ থেকে জরুরি পরিস্থিতির জন্য ক্যানজাত খাবার ও পানির মতো প্রয়োজনীয় সামগ্রী মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জার্মানি সম্ভাব্য রুশ হামলার আশঙ্কায় হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত করছে। দেশটির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎস ইউরোপের স্বাধীনতা ও শান্তি রক্ষার ক্ষেত্রে বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘সংকটময় মুহূর্ত’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এমনকি ঐতিহ্যগতভাবে নিরপেক্ষ দেশ সুইজারল্যান্ডও সশস্ত্র হামলা মোকাবিলা ও জাতীয় প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে নতুন নিরাপত্তা কৌশল গ্রহণ করেছে।
পোল্যান্ডে মার্কিন ঘাঁটি, মস্কোয় গোপন বার্তা
এদিকে পোল্যান্ডে স্থায়ী মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের অগ্রগতির কথা জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর আগে, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে সিআইএ পরিচালককে গোপন মিশনে মস্কোয় পাঠিয়েছিলেন তিনি। ওই সফরে ন্যাটোভুক্ত কোনো দেশের ভূখণ্ডে হামলা না চালাতে ক্রেমলিনকে সতর্ক করা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
পশ্চিমা দেশগুলোর আশঙ্কা, রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যেকোনো সময় সীমিত পরিসরে হলেও ন্যাটোর ভূখণ্ডে হামলা চালানোর সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। পশ্চিমা গোয়েন্দাদের ধারণা, ন্যাটোর ঐক্য এবং জোটের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা নিশ্চয়তার ভিত্তি আর্টিকেল-৫ কতটা কার্যকর, তা পরীক্ষা করাই এমন পদক্ষেপের উদ্দেশ্য হতে পারে।
ইউরোপজুড়ে বাড়ছে ‘হাইব্রিড হামলা’
চলতি সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্র রুশ হুমকির একটি নমুনা পেয়েছে। মার্কিন ফেডারেল প্রসিকিউটররা রুশ গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেছেন। তাদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গুপ্তহত্যা ও হামলার পরিকল্পনা করার অভিযোগ আনা হয়েছে। একই নেটওয়ার্ক ইউরোপের বেসামরিক ও সামরিক অবকাঠামোতে হামলার নির্দেশ দিয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।
গত কয়েক বছর ধরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে সাইবার হামলা, নাশকতা, অগ্নিসংযোগ, ড্রোন হামলা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলার মতো ঘটনা ঘটেছে। গত মাসে জার্মানির একটি বেসামরিক বিমানবন্দরে ড্রোন হামলার জন্যও রাশিয়াকে দায়ী করা হয়েছিল।
ন্যাটোর জন্য সবচেয়ে বড় কৌশলগত চ্যালেঞ্জ হলো—এসব কর্মকাণ্ড সরাসরি যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই পরিচালনা করা সম্ভব। ন্যাটোর আকাশসীমায় ড্রোন ওড়ানো, বিমানবন্দর অচল করে দেওয়া, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে নাশকতা চালানো কিংবা অপরাধী চক্রের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ড ঘটানোর মতো পদক্ষেপ বাড়তে পারে। একই সঙ্গে এসব ঘটনার দায় অস্বীকার করার সুযোগও থাকে মস্কোর।
পশ্চিমা দেশগুলোর অভিযোগ, পুতিন এই অনিশ্চয়তা এবং দায় অস্বীকারের সুযোগকে কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছেন। এর মাধ্যমে তিনি ন্যাটোর প্রতিক্রিয়া ও ঐক্য পরীক্ষা করছেন। কারণ, এমন হামলার জবাবে ন্যাটোর কী করা উচিত—বা আদৌ সামরিক প্রতিক্রিয়া জানানো উচিত কি না—এ নিয়ে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে মতভেদ তৈরি হতে পারে।
নজরে সুওয়ালকি করিডোর
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে সুওয়ালকি করিডোর। পোল্যান্ড ও লিথুয়ানিয়ার মধ্যবর্তী প্রায় ৬৫ মাইল দীর্ঘ এই সীমান্তই ন্যাটোর বাল্টিক সদস্য লিথুয়ানিয়া, লাটভিয়া ও এস্তোনিয়ার সঙ্গে জোটের বাকি ভূখণ্ডের একমাত্র স্থল সংযোগ।
ধরা যাক, রাশিয়া ও বেলারুশ মিলে করিডোরটির কিছু অংশ দখল করে নিল। এটি পোল্যান্ডে পূর্ণাঙ্গ ট্যাংক অভিযান চালানোর মতো প্রচলিত সামরিক হামলা নাও হতে পারে। বরং মস্কো এটিকে ‘সীমিত অনুপ্রবেশ’ হিসেবে বর্ণনা করে দাবি করতে পারে, তারা কোনো বড় যুদ্ধ চায় না।
একই সময়ে রাশিয়ার অনানুষ্ঠানিক প্রচারণায় এমন বার্তাও ছড়ানো হতে পারে যে, ন্যাটো পাল্টা সামরিক পদক্ষেপ নিলে তা পারমাণবিক সংঘাতে রূপ নিতে পারে।
এ ধরনের কৌশলের লক্ষ্য শুধু একটি সরু ভূখণ্ড দখল করা কিংবা বাল্টিক অঞ্চলকে বিচ্ছিন্ন করা নয়। এর মাধ্যমে ন্যাটোর পারস্পরিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি—আর্টিকেল-৫—কতটা কার্যকর, সেটিই প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
মাত্র একটি ছোট ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের জন্য ন্যাটোর ৩২টি সদস্যদেশ কি রাশিয়ার সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে? লিথুয়ানিয়ার মতো একটি সদস্যদেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র কি পারমাণবিক শক্তিধর রাশিয়ার সঙ্গে সংঘাতের ঝুঁকি নেবে? জার্মানি বা ফ্রান্সই বা কী করবে?
এসব প্রশ্নের নিশ্চিত উত্তর নেই। আর এই অনিশ্চয়তাই ন্যাটোর জন্য বড় উদ্বেগের কারণ।
বদলে গেছে ইউরোপের নিরাপত্তা ভাবনা
স্নায়ুযুদ্ধের পর তিন দশক ধরে ইউরোপের অনেক দেশ জাতীয় প্রতিরক্ষা প্রস্তুতিকে তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দিয়েছে। বড় ধরনের যুদ্ধের আশঙ্কাকে দূরবর্তী বলে ধরে নেওয়া হয়েছিল। কমানো হয়েছিল সামরিক ব্যয়, কমেছিল সেনাবাহিনীতে নিয়োগ। বেসামরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে গুরুত্ব হারিয়েছিল। তখন ধারণা ছিল, সংকট দেখা দিলে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের পাশে দাঁড়াবে।
কিন্তু সেই বাস্তবতা বদলে গেছে।
ট্রাম্পের বিভিন্ন বক্তব্য ও সিদ্ধান্তে যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপনীতি নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে এমন আশঙ্কাও রয়েছে যে, ওয়াশিংটন রাশিয়া ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করার দিকে এগোতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ইউরোপ নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়াতে তৎপর হয়েছে। সুওয়ালকি করিডোরের কাছে বেলারুশের সামরিক মহড়াও সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
ইউরোপীয় দেশগুলোর কাছে এখন বড় প্রশ্ন—সম্ভাব্য সংঘাত কীভাবে ঠেকানো যাবে। এর একটি উপায় হিসেবে রাশিয়াকে বোঝানোর চেষ্টা করা হচ্ছে যে, ন্যাটোর ভূখণ্ডে হামলা চালালে তার কঠোর প্রতিক্রিয়া হবে।
তবে ইউরোপের একের পর এক জরুরি পদক্ষেপ দেখে মস্কো যদি এর বিপরীত কোনো বার্তা পায়, সেটিই হয়ে উঠতে পারে ইউরোপের সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা উদ্বেগ।


