প্রথম দেখাতেই প্রেম। এক দেখায় ভালো লাগা থেকে প্রেম, আর সেই প্রেম থেকে আজীবন একসাথে পথ চলার স্বপ্ন। কিন্তু বিয়ের পিঁড়িতে বসার আগে তাঁদের সামনে এসে দাঁড়াল জীবনের সবচেয়ে বড় ও অস্বস্তিকর এক ধাঁধা—তাঁরা কি আসলেই কেবলই প্রেমিক-প্রেমিকা, নাকি নিজেদের অজান্তেই তাঁরা পরস্পরের সৎ ভাই-বোন?
রোববার (৩০ আগস্ট) বিবিসি-র এক বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ফ্রান্সের আর্থার কেরমালভেজেন ও অড্রে দম্পতির জীবনের এমনই এক রোমহর্ষক ও অবিশ্বাস্য সত্যের গল্প।
গল্পের শুরু ২০১০ সালে। দাতা-সন্তানদের (শুক্রাণু দাতার মাধ্যমে জন্ম নেওয়া সন্তান) অধিকার নিয়ে কাজ করা একটি অনুষ্ঠানে প্রথম দেখা হয় আর্থার ও অড্রের। অড্রের ভাষায়, ‘সেটি ছিল প্রথম দেখাতেই প্রেম।’ কিন্তু মন দেওয়া-নেওয়ার পরই তাঁদের সামনে চলে আসে এক অদ্ভুত ও ভীতিকর প্রশ্ন। কারণ, দুজনেই ছিলেন শুক্রাণু দাতার মাধ্যমে জন্ম নেওয়া সন্তান।
তাঁদের জন্মের সময় প্যারিসে মাত্র দুটি শুক্রাণু ব্যাংক ছিল এবং একই পুরুষ একাধিকবার শুক্রাণু দান করতেন। ফলে একই দাতার সন্তান হওয়ার কারণে তাঁরা যে পরস্পরের সৎ ভাই-বোন, এই আশঙ্কাকে কোনোভাবেই উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছিল না।
আর্থার ছোটবেলা থেকেই এক ধরনের পরিচয়হীনতার কষ্টে ভুগতেন। স্কুলে বা বাসে যাওয়ার সময় অপরিচিত কোনো পুরুষকে দেখলেই মনে হতো—এই মানুষটিই কি তাঁর জৈবিক বাবা? অন্যদিকে, পেশায় আইনজীবী অড্রে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর জানতে পারেন তাঁর জন্মও এক অজ্ঞাত দাতার মাধ্যমে। আর্থারের লেখা একটি বই পড়ে অড্রে নিজের অনুভূতির সঙ্গে মিল খুঁজে পান এবং তাঁদের মধ্যে সখ্যতা গড়ে ওঠে।
প্রেমের সম্পর্ককে পরিণয়ে রূপ দেওয়ার আগে এই যুগল জানতে চেয়েছিলেন তাঁদের রক্তের কোনো সম্পর্ক আছে কি না। কিন্তু ফ্রান্সের কঠোর আইন তাঁদের সামনে পাহাড়সম বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ১৯৯৪ সাল থেকে ফ্রান্সে দাতার পরিচয় গোপন রাখার কঠোর বিধান রয়েছে। এমনকি ব্যক্তিগতভাবে ডিএনএ পরীক্ষা করাও সেখানে দণ্ডনীয় অপরাধ। গবেষক বা আদালতের নির্দেশ ছাড়া বাড়িতে ব্যবহারের ডিএনএ টেস্ট কিট রাখার অপরাধে সাড়ে তিন হাজার ইউরো পর্যন্ত জরিমানার নিয়ম রয়েছে।
বাধ্য হয়ে এই প্রেমিক-যুগল দক্ষিণ ফ্রান্সের এক চিকিৎসকের দ্বারস্থ হন এবং ৯০০ ইউরো দিয়ে গোপনে একটি জেনিটিক পরীক্ষা করান। পরীক্ষার ফলাফলে দেখা যায় তাঁদের মধ্যে রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু অনানুষ্ঠানিক ও গোপন এই পরীক্ষার নির্ভুলতা নিয়ে তাঁদের মনে চরম সংশয় থেকে যায়। অড্রে তাঁর দাতার পরিচয় জানতে আদালতে দীর্ঘ আইনি লড়াই শুরু করলেও বিচারকের লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে বারবার ব্যর্থ হন।
অবশেষে ২০১৩ সালে আর্থার ও অড্রে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন—এক অর্থে স্রেফ ভাগ্য ও ‘বিশ্বাসের ওপর ভর করে’। পরবর্তীতে অবশ্য তাঁরা চিকিৎসকদের মাধ্যমে জানতে পারেন যে তাঁদের সম্ভাব্য দুই দাতার জন্মসাল আলাদা ছিল, অর্থাৎ একই ব্যক্তি তাঁদের বাবা নন। কিন্তু পুরোপুরি নিশ্চিন্ত হতে তাঁরা আইন অমান্য করেই গোপনে বাড়িতে ডিএনএ টেস্ট কিট দিয়ে পরীক্ষা করেন। সেই চূড়ান্ত পরীক্ষায় নিশ্চিত হওয়া যায়—তাঁদের রক্তের কোনো সম্পর্ক নেই।
তবে সেই ডিএনএ টেস্টের রিপোর্ট তাঁদের জীবনে আরও বড় ও অভাবনীয় কিছু বিস্ময় নিয়ে আসে। ২০১৭ সালের বড়দিনে আর্থার অবশেষে তাঁর আসল জৈবিক বাবার খোঁজ পান। আর অড্রের ক্ষেত্রে ঘটে যায় এক মিরাকল! তিনি ডিএনএ পরীক্ষায় জানতে পারেন—আদালতে সোফি নামে যে নারীর পক্ষে তিনি একবার আইনজীবী হিসেবে আইনি লড়াই লড়েছিলেন, সেই সোফি আর কেউ নন, স্বয়ং তাঁর আপন জৈবিক বোন!
তাঁদের পরিচিত ১০ জন দাতা-সন্তানের ডিএনএ পরীক্ষা করে দেখা গেছে, তাদের মধ্যে ৪ জনই একই দাতার সন্তান হিসেবে সনাক্ত হয়েছেন। অর্থাৎ, সৎ ভাই-বোন হওয়ার যে ভয় তাঁদের তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল, তা কতটা বাস্তব ছিল—তা এই পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট।
পরবর্তীতে অড্রে তাঁর জৈবিক পিতা ফিলিপের পরিচয় জানতে পেরেছিলেন। তবে তত দিনে ফিলিপ মারা গেছেন। ফিলিপের পরিবারের সঙ্গে দেখা করে অড্রে তাঁর শিকড় এবং পারিবারিক ইতিহাস সম্পর্কে জানতে পারেন। ফিলিপের ছবি ও ভিডিও দেখতে পাওয়া এবং তাঁর রেকর্ড করা কণ্ঠস্বর শুনতে পাওয়াটা অড্রের জন্য ছিল এক চরম আবেগঘন মুহূর্ত।
বর্তমানে আর্থার ও অড্রে তিন সন্তানের জনক-জননী। তাঁদের এই দীর্ঘ লড়াই ও আর্থারের লেখা বইয়ের প্রভাবে অবশেষে ফ্রান্সের কঠোর আইনে বদল এসেছে। ২০২৫ সালের এপ্রিলের পর জন্ম নেওয়া দাতা-সন্তানেরা প্রাপ্তবয়স্ক হলে তাদের জৈবিক দাতার পরিচয় জানার আইনি অধিকার পেয়েছে।
তবে অড্রের মতে, তাঁদের লড়াই এখনও শেষ হয়নি। তিনি বলেন, ‘পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের নিজের শিকড়, নিজের পরিচয় এবং নিজের পারিবারিক ইতিহাস জানার শতভাগ অধিকার রয়েছে।’


