যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থীদের আবেদনের সংখ্যা আগের বছরের তুলনায় এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি হ্রাস পেয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত বার্ষিক পরিসংখ্যান থেকে এই তথ্য জানা গেছে। রেকর্ড পরিমাণ আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা এবং এ সংক্রান্ত বিশাল সরকারি ব্যয় কমানোর জন্য লড়তে থাকা ব্রিটিশ সরকারের জন্য এটিকে একটি বড় অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত জুন পর্যন্ত পূর্ববর্তী ১২ মাসে যুক্তরাজ্যে মোট ৮৫,৮৯১ জন মানুষ রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেছেন, যা আগের বছরের তুলনায় ২১ শতাংশ কম। এটি ২০২২ সালের জুনের পর থেকে এ যাবৎকালের সর্বনিম্ন বার্ষিক আবেদনের রেকর্ড।
আবেদনকারীদের মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশই ইংলিশ চ্যানেল পাড়ি দিয়ে ছোট নৌকায় করে বিপজ্জনক উপায়ে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছিলেন। এই অবৈধ রুটটি ব্রিটেনে উগ্র ডানপন্থীদের উত্থানের পেছনে বড় জ্বালানি হিসেবে কাজ করেছে।
তবে একই সময়ে ছোট নৌকায় করে অবৈধ অনুপ্রবেশের হারও ২৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ব্রিটেনের ক্ষমতাসীন মধ্য-বামপন্থী লেবার পার্টির দাবি—ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যৌথভাবে ‘আপস্ট্রিম’ বা অনুপ্রবেশের উৎসেই মানবপাচার প্রতিহত করার সরকারি নীতি সফল হওয়ার কারণেই এই সংখ্যা কমেছে।
আশ্রয়ের আবেদন কমার পাশাপাশি যুক্তরাজ্যে ‘আশ্রয় ব্যাকলগ’ বা ঝুলে থাকা আবেদনের জটও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকা এবং ট্রাইব্যুনালে আপিল নিষ্পত্তির অপেক্ষায় থাকা আবেদনকারীদের সংখ্যা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
চলতি বছরের জুন পর্যন্ত প্রাথমিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকা আবেদনকারীর সংখ্যা ৫৬ শতাংশ কমে ৪০,১৬৮ জনে দাঁড়িয়েছে, যা ২০১৯ সালের মার্চের পর সর্বনিম্ন।
একই সঙ্গে, আশ্রয়প্রার্থীদের সাময়িকভাবে বিভিন্ন হোটেলে রাখার সংখ্যাও আগের বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক কমে ১৬,০২১ জনে নেমে এসেছে। এই হোটেল ব্যবহারের বিষয়টি যুক্তরাজ্যে অত্যন্ত বিতর্কিত এবং বিভিন্ন সময় সহিংস বিক্ষোভের অন্যতম কারণ ছিল। ২০২৪ সালের জুলাইয়ে ক্ষমতায় আসা লেবার পার্টি প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, ২০২৯ সালের মধ্যে তারা আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য হোটেলের ব্যবহার সম্পূর্ণ বন্ধ করবে।
হ্রাস পেয়েছে সরকারি ব্যয়
আশ্রয়প্রার্থীর সংখ্যা এবং ব্যাকলগ কমে যাওয়ায় এ সংক্রান্ত খাতে সরকারের বার্ষিক ব্যয় ৮ শতাংশ কমে ৪.৩৬ বিলিয়ন পাউন্ডে (প্রায় ৫ বিলিয়ন ইউরো) নেমে এসেছে। এই ব্যয়ের মধ্যে আশ্রয়প্রার্থীদের সরাসরি আর্থিক সহায়তা, আবাসন, প্রশাসনিক কর্মী এবং সীমান্ত নিরাপত্তা কার্যক্রমের খরচ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এটি টানা দ্বিতীয় বছরের মতো এই খাতের সরকারি ব্যয় হ্রাসের ঘটনা।
নতুন প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যামের কেবিনেটে বহাল থাকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বলেন, এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে সরকার সীমান্ত ও আশ্রয় ব্যবস্থার ওপর ‘নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার’ করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ক্ষমতায় আসার মাত্র দুই বছরের কিছু বেশি সময়ের মধ্যে আমরা আশ্রয় ব্যাকলগ এবং হোটেলে আশ্রয়প্রার্থী রাখার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে পেরেছি।’ তবে এই সফলতায় মন্ত্রীরা আত্মতুষ্টিতে ভুগছেন না বলেও জানান তিনি।
তবে সরকারের এই সাফল্যের দাবির বিপরীত চিত্র তুলে ধরেছে দেশটির স্বাধীন সমতা নিয়ন্ত্রক এবং জাতীয় মানবাধিকার সংস্থা ‘ইকুয়ালিটি অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস কমিশন’। বৃহস্পতিবার সংস্থাটি জানিয়েছে, অভিবাসী এবং আশ্রয়প্রার্থীদের অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকারের নীতিমালা ও পদক্ষেপগুলো তাদের মূল্যায়নে সর্বনিম্ন র্যাংকিং বা স্কোর পেয়েছে।
ইএইচআরসি জানায়, জাতিসংঘ-এর মানবাধিকার সুপারিশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অভিবাসীদের মৌলিক অধিকার রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে বর্তমান সরকার। তারা সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঘাটতি এবং অভিবাসীদের চরম দারিদ্র্য ও নিঃস্ব হওয়া থেকে রক্ষা করতে সরকারি ব্যর্থতার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছে।


