ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগদানের বিষয়ে স্থগিত হয়ে থাকা আলোচনা পুনরায় চালু করার প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন আইসল্যান্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ। দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আরইউভি রবিবার এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী—এ পর্যন্ত গণনা করা ১ লাখ ৮৮ হাজার ৪৯৬টি ভোটের মধ্যে ৫২.৫ শতাংশ ভোটার সরকারের প্রস্তাবের বিপক্ষে অর্থাৎ ‘না’ ভোট দিয়েছেন। অন্যদিকে ৪৭.৫ শতাংশ ভোটার প্রস্তাবের পক্ষে অর্থাৎ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিয়েছেন। মাত্র ৯,৫০০ ভোটের ব্যবধানে ইইউতে যোগদানের আলোচনা শুরুর প্রস্তাবটি নাকচ হয়ে গেছে।
আইসল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ক্রিস্ট্রুন ফ্রস্টাডোটিরের মধ্য-বামপন্থী সরকার মূলত ২০২৭ সালের মধ্যে এই গণভোট আয়োজন করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। তবে গ্রিনল্যান্ড দখল করার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক হুমকি এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক উত্তেজনার কারণে সরকার নির্ধারিত সময়ের আগেই এই গণভোটের আয়োজন করে।
অবশ্য প্রায় ৪ লাখ জনসংখ্যার এই দ্বীপরাষ্ট্রটিতে গণভোটের মূল প্রচারণায় নিরাপত্তার চেয়ে দেশটির ‘মৎস্য শিল্প’ নিয়ে বিতর্কই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে।
আইসল্যান্ড ইতিমধ্যেই ইইউর একক বাজার (ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল) এবং শেনজেন পাসপোর্টমুক্ত অঞ্চলের সদস্য। ইইউর পূর্ণ সদস্যপদ পেলে দেশটি ইইউর কাস্টমস ইউনিয়ন এবং পরবর্তীতে ইউরোপীয় একক মুদ্রা ‘ইউরো’র আওতায় চলে যেত।
এর আগে ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা এবং আইসল্যান্ডের ব্যাংকিং ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার পর, ২০০৯ সালে ইইউতে যোগদানের জন্য প্রথম আনুষ্ঠানিক আবেদন করেছিল দেশটি। কিন্তু ২০১৩ সালে একটি ইউরো-সংশয়বাদী (ইইউ বিরোধী) সরকার ক্ষমতায় আসার পর আলোচনা স্থগিত করে দেওয়া হয়। সে সময়ও মৎস্য আহরণের অধিকার বা ফিশিং রাইটস ছিল প্রধান বাধা, যা আজও অপরিবর্তিত রয়েছে।
আইসল্যান্ডের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৪০ শতাংশই আসে মৎস্য ও সামুদ্রিক খাদ্য শিল্প থেকে। ‘না’ ভোট দেওয়া ভোটারদের বড় অংশই আশঙ্কা করেছিলেন যে—ইইউর সাধারণ মৎস্য নীতিমালার অধীনে চলে গেলে আইসল্যান্ড তার লাভজনক মৎস্য অঞ্চলের ওপর নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ হারাবে।
শনিবার রাজধানী রেইকিয়াভিকে ভোট দেওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী ফ্রস্টাডোটির বলেন, এই গণভোটের প্রচারণাটি বিশ্বের দরবারে আইসল্যান্ডের প্রকৃত অবস্থান কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেন, ‘এটি একটি ঐতিহাসিক দিন, আমরা এই ভোটের অধিকারের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছি।’ তিনি স্পষ্ট করেন যে, গণভোটের ফলাফল যাই হোক না কেন, তাঁর সরকার কাজ চালিয়ে যাবে।
ব্যালট পেপারে ভোটারদের কাছে প্রশ্ন রাখা হয়েছিল: “আইসল্যান্ডের কি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সদস্যপদ পাওয়ার আলোচনা পুনরায় শুরু করা উচিত?”
এই ভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও তা সরাসরি ইইউতে যোগদানের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতো না, বরং এটি একটি খসড়া চুক্তির দিকে আলোচনাকে এগিয়ে নিত, যা পরবর্তীতে দ্বিতীয় আরেকটি গণভোটের মাধ্যমে জনগণের অনুমোদন পেতে হতো। একইভাবে, এই ‘না’ ভোটের অর্থ এই নয় যে আইসল্যান্ড ভবিষ্যতে আর কখনোই ইইউর সঙ্গে আলোচনায় বসতে পারবে না।
অর্থনৈতিক স্বার্থের পাশাপাশি এই গণভোটে নিরাপত্তা ইস্যুটিও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আইসল্যান্ড পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হলেও দেশটির নিজস্ব কোনো সামরিক বাহিনী বা সেনাবাহিনী নেই। প্রতিরক্ষার জন্য দেশটি সম্পূর্ণভাবে তার মিত্রদের ওপর নির্ভরশীল।
ইউক্রেনে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আক্রমণের পর থেকে আইসল্যান্ড কিয়েভকে সমর্থন দিয়ে আসছে। কিন্তু সম্প্রতি দ্বীপটির কাছাকাছি আন্তর্জাতিক জলসীমায় রাশিয়ার সাবমেরিন ও নৌবাহিনীর ব্যাপক তৎপরতা এবং গ্রিনল্যান্ড দখল করার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আগ্রহ আইসল্যান্ডের নীতিনির্ধারকদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত করে তুলেছে। তা সত্ত্বেও, নিজেদের মৎস্য সম্পদের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখাকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিল আইসল্যান্ডের জনগণ।


