ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য হওয়ার দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছে মন্টেনেগ্রো। তবে নিজেদের আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রাখা এবং ইইউতে যোগদানের ক্ষেত্রে নিজেদের ধীরগতির অস্বস্তিকর প্রশ্ন এড়াতে সার্বিয়া মন্টেনেগ্রোর পথ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ইউরোপীয় কর্মকর্তারা, কূটনীতিক ও বিশেষজ্ঞরা।
মন্টেনেগ্রো বর্তমানে ইইউ সম্প্রসারণ প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থী দেশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। ইউরোপীয় কমিশনও দেশটিকে এই প্রক্রিয়ার ‘ফ্রন্টরানার’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।
কিন্তু মন্টেনেগ্রো যখন সদস্যপদের শেষ ধাপের দিকে এগোচ্ছে, তখন সার্বিয়ার ইইউ সদস্য হওয়ার প্রক্রিয়া অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। বেলগ্রাদ এখনো ইইউর সঙ্গে সব আলোচনাপর্ব খুলতে পারেনি এবং তাদের সর্বশেষ প্রচেষ্টাও কয়েকটি সদস্যরাষ্ট্রের বাধার মুখে পড়েছে।
জুলাইয়ে প্রার্থী দেশগুলোর বার্ষিক অগ্রগতি প্রতিবেদন নিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ভোটের আগে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ক্রোয়েশিয়ার সমাজতান্ত্রিক দলের এমইপি টোনিনো পিকুলা বলেন, সার্বিয়ার সরকার ও বিরোধী দলের কিছু কর্মকাণ্ড মন্টেনেগ্রোর অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
ইউরোপীয় কমিশন ও বিভিন্ন জাতীয় সরকারের সঙ্গে কাজ করা তিন কর্মকর্তা ইউরোনিউজকে জানান, মন্টেনেগ্রোর অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের এমন প্রচেষ্টার বিষয়ে তারা অবগত। ইইউর জন্য এটি একটি ব্যতিক্রমধর্মী জটিলতা তৈরি করেছে।
‘ভেতর থেকে প্রভাবিত করার চেষ্টা’
মন্টেনেগ্রোর সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী জোভানা মারোভিচ ইউরোনিউজকে বলেন, সার্বিয়া দেশের অভ্যন্তর থেকে মন্টেনেগ্রোকে প্রভাবিত করার জন্য সম্ভাব্য সব চেষ্টা করছে।
তার ভাষায়, মন্টেনেগ্রো ইইউতে যোগ দেওয়ার পরও এসব প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে, যদিও তখন নির্দিষ্ট কিছু লক্ষ্য বাস্তবায়ন করা অনেক কঠিন হয়ে যাবে।
মারোভিচের অভিযোগ, মন্টেনেগ্রোর ইইউ সদস্যপদ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে বেলগ্রাদ বিভিন্ন উদ্যোগে সমর্থন দিচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে দেশটির সংবিধানে মন্টেনেগ্রিন ভাষার পাশাপাশি সার্বিয়ান ভাষাকে রাষ্ট্রীয় বা সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়ার চেষ্টা।
এ ছাড়া রাজধানী পডগোরিকার জাতীয় গ্রন্থাগারের নাম পরিবর্তন নিয়েও সম্প্রতি বিতর্ক তৈরি হয়। ফ্যাসিবাদবিরোধী ব্যক্তিত্ব রাদোসাভ ল্যুমোভিচের নামে প্রতিষ্ঠিত গ্রন্থাগারটির নাম সামরিক নেতা ও লেখক মার্কো মিলিয়ানভের নামে করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। পরে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় সেই উদ্যোগ স্থগিত করে।
মারোভিচ মিলিয়ানভের ঐতিহাসিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন না তুললেও তিনি এটিকে একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ হিসেবে দেখছেন। তার মতে, পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতির স্বার্থে বারবার ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐতিহ্যকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।
তার অভিযোগ, সার্বিয়া পরিকল্পিতভাবে জাতিগত বিভাজন তৈরির চেষ্টা করছে। সার্বপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর স্থানীয় পর্যায়ের কিছু উদ্যোগের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, মন্টেনেগ্রোর কসোভোকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাতিলের চেষ্টাও চলছে।
তবে এখন পর্যন্ত এসব উদ্যোগ মন্টেনেগ্রোর ইইউ সদস্যপদ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি বলে মনে করছেন তিনি।
সংস্কার প্রশ্নে ব্যাপক রাজনৈতিক ঐক্য
মন্টেনেগ্রোর রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখন পর্যন্ত ইইউ সংস্কার প্রশ্নে উল্লেখযোগ্য ঐক্য ধরে রেখেছে। জুলাইয়ে দেশটির ৭৭ সদস্যের পার্লামেন্টে ৭৪ জন আইনপ্রণেতা সাংবিধানিক সংস্কার প্রক্রিয়া শুরুর পক্ষে ভোট দেন। শুধু কট্টর সার্বপন্থী একটি দল এর বিরোধিতা করে।আগস্টের শেষ দিকে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ৬৮ ভোটে সাংবিধানিক সংশোধনীগুলোও অনুমোদিত হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মন্টেনেগ্রো ইইউতে যোগদানের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। দেশটি ২০২৮ সালের মধ্যে ইইউর ২৮তম সদস্য হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগোচ্ছে এবং ইইউর সঙ্গে সদস্যপদসংক্রান্ত আলোচনায় ধারাবাহিকভাবে অগ্রগতি অর্জন করছে।
দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক টানাপোড়েন
পশ্চিম বলকানের অন্যান্য দেশের মতো মন্টেনেগ্রো ও সার্বিয়ার সম্পর্কের পেছনেও রয়েছে দীর্ঘ ও জটিল ইতিহাস।
১৮৭৮ সালে বার্লিন কংগ্রেসে মন্টেনেগ্রো সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পায়। পরে সার্বিয়ার সঙ্গে একীভূত হওয়ার মাধ্যমে সেই স্বাধীনতা হারালেও ২০০৬ সালে আবার স্বাধীনতা ফিরে পায়।
গত মে মাসে মন্টেনেগ্রোর স্বাধীনতার ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠান নিয়ে সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট আলেক্সান্দার ভুচিচ কটাক্ষ করেন। তিনি এটিকে ‘আমার সার্বিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার জাঁকজমকপূর্ণ উদযাপন’ হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।
পরের মাসে অবশ্য ভুচিচ মন্টেনেগ্রোর তিভাতে অনুষ্ঠিত ইইউ-পশ্চিম বলকান সম্মেলনে অংশ নেন। সেখানে তিনি দাবি করেন, মন্টেনেগ্রোর অপরাধী চক্রের সম্ভাব্য হত্যাচক্রান্ত নিয়ে সার্বিয়ার গোয়েন্দারা তাকে উচ্চ নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়ে সতর্ক করেছিলেন।
বলকান ইন ইউরোপ পলিসি অ্যাডভাইজরি গ্রুপের সমন্বয়ক ফ্লোরিয়ান বিবার বলেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে।
তার মতে, মন্টেনেগ্রোর ইইউ সদস্যপদ সার্বিয়ার জন্য অস্বস্তিকর কিছু প্রশ্ন তৈরি করবে।
পোলিশ সেন্টার ফর ইস্টার্ন স্টাডিজের মূল্যায়ন অনুযায়ী, মন্টেনেগ্রোর ইইউ সদস্যপদ সার্বিয়ার পশ্চিম বলকানে আঞ্চলিক নেতৃত্বের অবস্থানকে দুর্বল করতে পারে এবং পডগোরিকার ওপর বেলগ্রাদের প্রভাব কমিয়ে দিতে পারে। ফলে সার্বিয়া দেশটিকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করতে পারে।
সার্বিয়ার অস্বীকৃতি
তবে এসব অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে সার্বিয়া।
ইইউতে নিযুক্ত সার্বিয়ার রাষ্ট্রদূত দানিয়েল আপোস্তোলোভিচ ইউরোনিউজকে বলেন, মন্টেনেগ্রোর ইইউ সদস্যপদ প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করার কোনো আগ্রহ সার্বিয়ার নেই।
তিনি বলেন, তাদের মূল মনোযোগ নিজেদের সংস্কার প্রক্রিয়া ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে।
একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, সার্বিয়ার বিষয়ে ইইউর কয়েকটি সদস্যরাষ্ট্র এখনো কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। ইউরোপীয় কমিশন পাঁচবার সার্বিয়ার জন্য ‘ক্লাস্টার ৩’ খোলার সুপারিশ করলেও তা এখনো সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি।
বর্তমানে মন্টেনেগ্রোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নাগরিক জাতিগতভাবে সার্ব। রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন গোষ্ঠী, গণমাধ্যম এবং সার্বিয়ান অর্থোডক্স চার্চের মাধ্যমে বেলগ্রাদ প্রতিবেশী দেশটিতে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বজায় রেখেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
ব্রাসেলসের জন্য কঠিন সমীকরণ
সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর অবনতিশীল সম্পর্ক ব্রাসেলসের জন্য একটি জটিল পরিস্থিতি তৈরি করেছে।
একদিকে মন্টেনেগ্রো ইইউর সদস্য হওয়ার সবচেয়ে কাছাকাছি থাকা প্রার্থী দেশ। অন্যদিকে পশ্চিম বলকানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী দেশগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত সার্বিয়া।
মন্টেনেগ্রোর সদস্যপদ প্রক্রিয়ায় অগ্রগতি অব্যাহত থাকলেও সার্বিয়ার ইইউ যাত্রা তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে আছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভুচিচ নিজেও দ্রুত ইইউ সম্প্রসারণের সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।
ইউরোপীয় কমিশন সার্বিয়ার সদস্যপদ প্রক্রিয়াকে আবার গতিশীল করার চেষ্টা করেছে মূলত এমন কিছু সদস্যরাষ্ট্রের চাপের কারণে, যারা মনে করে পশ্চিম বলকানে সার্বিয়াকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়।
এদিকে বেলগ্রাদের অভিযোগ, ইইউ সদস্যপদ প্রক্রিয়া পুরোপুরি যোগ্যতা ও সংস্কারের ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে না; বরং ভূরাজনৈতিক বিবেচনাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সার্বিয়া মন্টেনেগ্রোতে শক্তিশালী অপরাধী চক্রগুলোর উপস্থিতির বিষয়টি তুলে ধরে দেশটিতে আইনের শাসন এখনো ইইউর মানদণ্ডে পৌঁছায়নি বলে দাবি করে।
ভাষার প্রশ্নেও দুই দেশের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ২০২৩ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, সার্বরা মন্টেনেগ্রোর সবচেয়ে বড় জাতিগত সংখ্যালঘু হলেও সার্বিয়ান ভাষা দেশটিতে সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃত নয়। বিপরীতে সার্বিয়া আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সংখ্যালঘু ভাষাকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
তবে পডগোরিকার দাবি, বিভিন্ন জাতিগত গোষ্ঠীকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার কারণেই ইইউ সংস্কারে দেশটি দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করতে পেরেছে।
ইউরোনিউজকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কূটনীতিক বলেন, কিছু সার্বপন্থী দল সংস্কার প্রক্রিয়ায় অংশ নিলেও অন্যরা কার্যত ‘বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতিনিধি’ হিসেবে কাজ করছে।
ওই কূটনীতিকের ভাষায়, সার্বিয়া মন্টেনেগ্রোর ইইউ সদস্যপদের পথের জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
তার মতে, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সব পক্ষের স্বার্থ সমন্বয়ে প্রতিদিন কাজ করাই প্রতিবেশীদের তুলনায় মন্টেনেগ্রোকে আলাদা করেছে।
পশ্চিম বলকানের সমাজগুলোতে জাতিগত বিভাজন এখনো গভীর। ভবিষ্যতে এই বিভাজন আবার তীব্র হলে ইইউ সদস্যপদের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন মন্টেনেগ্রোর জন্য অনেক কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
তাই ভবিষ্যতের চাপের মধ্যেও বর্তমান রাজনৈতিক ঐক্য কতটা ধরে রাখতে পারে পডগোরিকা, তার ওপরই অনেকাংশে নির্ভর করবে দেশটির ইইউ সদস্য হওয়ার পথ। আর এই পুরো প্রক্রিয়ায় অস্বস্তিকর এক অবস্থান থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে ব্রাসেলস।


