ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন বায়োমেট্রিক সীমান্ত তল্লাশি চালুর পর পর্তুগালের ফারো বিমানবন্দরে যাত্রীদের তীব্র চাপ তৈরি হয়েছে। তবে পুলিশ জানিয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে যাত্রীদের ভিড় বাড়লেও বড় ধরনের কোনো বিঘ্ন ছাড়াই নতুন এই ব্যবস্থাটি সামগ্রিকভাবে কার্যকর রয়েছে। গত ৬ সেপ্টেম্বর থেকে শেনজেন এলাকার বাইরে থেকে আসা সকল যাত্রীর ছবি এবং আঙুলের ছাপসহ বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।
পর্তুগিজ জননিরাপত্তা পুলিশ (পিএসপি)-এর ডেপুটি ন্যাশনাল ডিরেক্টর জোয়াও রিবেইরো জানান, পর্তুগালের অন্যান্য বিমানবন্দরে পুরো প্রক্রিয়াটি ‘মসৃণভাবে’ চললেও, একের পর এক ফ্লাইট অবতরণের কারণে ফারো বিমানবন্দরে সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি হয়েছে। তিনি গত বৃহস্পতিবারের (১০ সেপ্টেম্বর) উদাহরণ টেনে বলেন, সেদিন মাত্র ২৫ মিনিটের ব্যবধানে ১০টিরও বেশি বিমান সেখানে অবতরণ করেছিল, যার সিংহভাগ যাত্রীই ছিলেন ব্রিটিশ নাগরিক।
সংবাদ সংস্থা লুসাকে তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই এটি সীমান্তে বাড়তি চাপের সৃষ্টি করেছে।’ তিনি জানান, খারাপ আবহাওয়া বা বিমানের বিলম্বের কারণে প্রায়ই অনির্ধারিতভাবে একাধিক ফ্লাইট একসঙ্গে এসে পৌঁছায়।
এদিকে লিসবন বিমানবন্দরের বিষয়ে রিবেইরো জানান, আগে ভিড়ের সময় বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার সুযোগ থাকায় ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ায় ৫ থেকে ১৫ মিনিট সময় লাগত। কিন্তু বর্তমানে এই ব্যবস্থাটি শতভাগ কার্যকর থাকায় অপেক্ষার সময় বেড়ে ১৫ থেকে ৩০ মিনিটে দাঁড়িয়েছে, যাকে তিনি ‘বেশ গ্রহণযোগ্য’ বলে উল্লেখ করেছেন। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন জুড়ে ধাপে ধাপে এই এন্ট্রি/এক্সিট সিস্টেম (ইইএস) চালু হয়েছিল।
চলতি বছরের শুরুর দিকে পর্তুগালের বিমানবন্দরগুলোতে, বিশেষ করে লিসবনে দীর্ঘ লাইনের কারণে যাত্রীদের কয়েক ঘণ্টা পর্যন্ত ভোগান্তি পোহাতে হয়েছিল। মে মাসের শেষ থেকে নতুন প্রযুক্তির সংযোজন, যাত্রী চলাচলের পথ পুনর্বিন্যাস এবং অতিরিক্ত ৩৬০ জন পুলিশ কর্মকর্তা মোতায়েন করার পর পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি ঘটে।
বর্তমানে পর্তুগালজুড়ে বিমানবন্দর নিরাপত্তা ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে পিএসপির ‘ন্যাশনাল ইউনিট ফর ফরেনার্স অ্যান্ড বর্ডার্স’-এর মোট ১,৫০৪ জন কর্মকর্তা নিয়োজিত রয়েছেন। এর মধ্যে লিসবনে সর্বোচ্চ ৭০৬ জন, পোর্তোয় ৩২৫ জন এবং ফারোতে ২১৫ জন দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া মাদেইরাতে ১১৫ জন, অ্যাজোরেসে ১২৪ জন এবং বেজায় ১৯ জন কর্মকর্তা রয়েছেন।
রিবেইরো জানান, বাহিনীটি বর্তমানে নির্ধারিত জনবলের প্রায় ৮০ শতাংশ নিয়ে কাজ করছে। তবে এখন শুধু কর্মকর্তার সংখ্যা বাড়ানোর চেয়ে জালিয়াতি করা নথি শনাক্তকরণ এবং অভিবাসন ঝুঁকি নিরূপণে দক্ষ জনবল গড়ে তোলার ওপর বেশি জোর দেওয়া হচ্ছে।
বছরের শুরুর মতো চরম বিশৃঙ্খলা এড়ানো সম্ভব হবে বলে পুলিশ আশাবাদী হলেও, ভবিষ্যতে কোনো বিলম্ব হবে না—এমন কোনো শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে রাজি নন রিবেইরো। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ‘কোনো নিশ্চিত নিশ্চয়তা আমরা দিতে পারি না, কারণ পুরো বিমানবন্দর পরিচালনা মূলত প্রযুক্তি, পর্যাপ্ত জনবল এবং ইউরোপীয় ব্যবস্থার সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর নির্ভরশীল।’
একজোট পর্তুগাল ও ফিলিস্তিন
ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বসতি সম্প্রসারণের মাধ্যমে পশ্চিম তীরকে ‘রুদ্ধ’ বা শ্বাসরোধ করা হচ্ছে বলে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন পর্তুগালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী পাউলো রাঙ্গেল। তাঁর মতে, ইসরায়েলের এই আগ্রাসী পদক্ষেপের ফলে সংকট সমাধানের একমাত্র উপায় হিসেবে বিবেচিত ‘দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান’ বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
গত সোমবার লিসবনে ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারসেন শাহিনের সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে রাঙ্গেল বলেন, ‘এটি কোনোভাবেই দ্বি-রাষ্ট্র সমাধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। যে দেশই এই সমাধানের পক্ষে কথা বলে, তাদের অবশ্যই এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।’
পর্তুগিজ সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েল তথাকথিত ‘ই-১’ এলাকাকে পূর্ব জেরুজালেমের সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনা করছে, যা কার্যকর হলে পশ্চিম তীর ভৌগোলিকভাবে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়বে। ইসরায়েলের এই উদ্যোগকে ‘মারাত্মক ক্ষতিকর’ বলে আখ্যা দিয়ে পর্তুগিজ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই অবৈধ বসতির সহিংস বিস্তারকে ‘অসহনীয়’ বলে বর্ণনা করেন।
এ ছাড়া ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের (পিএ) নামে সংগৃহীত অর্থ ইসরায়েল যেভাবে আটকে রাখছে, তারও তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। রাঙ্গেল বলেন, ‘আমরা দেখছি ফিলিস্তিনি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রীতিমতো এক ধরনের অবরোধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে; অথচ শত প্রতিকূলতার মধ্যেও এসব প্রতিষ্ঠান ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও নাগরিক সমাজের কার্যকারিতা টিকিয়ে রেখেছিল।’
গাজা উপত্যকার পরিস্থিতি নিয়ে রাঙ্গেল উল্লেখ করেন যে সেখানে একটি স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠনের প্রক্রিয়া চলছে, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শান্তি উদ্যোগের ক্ষেত্রে এখনো ‘মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান কোনো ফলাফল মেলেনি’। তিনি বলেন, ‘গাজার মানবিক পরিস্থিতি এখনো অত্যন্ত সংকটজনক ও জটিল।’
সোমবার লিসবনে দুই পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে ঘণ্টাব্যাপী এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যাকে উভয় পক্ষই ‘অত্যন্ত ফলপ্রসূ’ বলে অভিহিত করেছে। বৈঠক শেষে পর্তুগাল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে দুটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরিত হয়। এর একটি হলো নিয়মিত রাজনৈতিক পরামর্শ সংক্রান্ত এবং অন্যটি উভয় দেশের কূটনীতিকদের প্রশিক্ষণ ও তথ্য-নথি আদান-প্রদান বিষয়ক।
২০২৫ সালের ২১ সেপ্টেম্বর পর্তুগাল ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার পর রাঙ্গেল ও শাহিনের মধ্যে এটিই ছিল প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। এ কারণে পর্তুগিজ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই মুহূর্তটিকে একটি ‘ঐতিহাসিক মুহূর্ত’ বলে উল্লেখ করেন। ফিলিস্তিনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ভারসেন শাহিনও পর্তুগিজ প্রতিপক্ষের সঙ্গে এই আলোচনাকে ‘গঠনমূলক ও ইতিবাচক’ বলে সন্তোষ প্রকাশ করেন। সংবাদ সম্মেলনটিতে সাংবাদিকদের কোনো প্রশ্নোত্তর পর্ব ছিল না।


