ইউরোপের শেনজেনভুক্ত এক দেশ থেকে অন্য দেশে অবৈধভাবে চলাচলকারী অভিবাসীদের জন্য পর্তুগাল ক্রমশ একটি জনপ্রিয় গন্তব্য এবং ট্রানজিট পয়েন্ট হয়ে উঠছে বলে সতর্ক করেছে দেশটির জাতীয় পুলিশ বাহিনী পিএসপি। সংস্থাটির জাতীয় বিদেশি ও সীমান্ত ইউনিটের (ইউএনইএফ) প্রধান চিফ সুপারিনটেনডেন্ট জোয়াও রিবেইরো জানিয়েছেন, ইউরোপের অন্যান্য দেশে অবৈধভাবে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক মানুষ এখন বাস ও ট্রেনে করে পর্তুগালের লিসবন ও পোর্তো মেট্রোপলিটন এলাকায় প্রবেশ করছে।
সংবাদ সংস্থা লুসাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রিবেইরো জানান, শেনজেনভুক্ত দেশগুলোতে সাধারণ নিয়মে নিয়মিত সীমান্ত তল্লাশি না থাকলেও পর্তুগালের বাস টার্মিনাল ও প্রধান রেলস্টেশনগুলোতে তারা ‘মোবাইল বর্ডার চেক’ জোরদার করেছেন। তিনি বলেন, অভিবাসীদের অনেকে ইউরোপের একাধিক দেশ ঘুরেও বৈধতা না পেয়ে পর্তুগালে আসছেন। আবার অনেকে পর্তুগালকে আয়ারল্যান্ড বা উত্তর ইউরোপের দেশগুলোতে পাড়ি জমানোর একটি ‘প্রবেশদ্বার’ হিসেবে ব্যবহার করছেন, যেখানে তাদের আত্মীয়স্বজন বা নিজস্ব জনগোষ্ঠীর শক্ত ভিত্তি রয়েছে। তবে কোন কোন দেশের নাগরিকরা এতে বেশি জড়িত, তা তিনি প্রকাশ করেননি।
এদিকে অভিবাসী অধিকার সংস্থাগুলো অভিযোগ তুলেছে যে, নতুন গঠিত ইউনিট ‘ইউএনইএফ’ যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসী তাড়ানোর মতো ‘অভিযান’ শুরু করেছে। তবে পুলিশ প্রধান এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে বলেন, তাদের অভিযানগুলো অন্ধ নয়, বরং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে পরিচালিত সুনির্দিষ্ট অভিযান। তিনি বলেন, ‘পর্তুগালে অনিয়মিতভাবে বসবাসকারী কোনো বিদেশি নাগরিক দেশে থাকতে পারবেন না, তাদের অবশ্যই প্রত্যাবাসন বা দেশত্যাগের প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।’
পর্তুগালের অভিবাসন সংস্থা ‘আইমা’ এবং তাদের অস্থায়ী টাস্কফোর্স দীর্ঘদিন আটকে থাকা আবেদনগুলো পর্যালোচনার পর এ পর্যন্ত ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষকে স্বেচ্ছায় দেশত্যাগের নোটিশ পাঠিয়েছে। রিবেইরো স্বীকার করেন যে, নোটিশ পাওয়া ব্যক্তিদের একটি বড় অংশ এখনো পর্তুগালেই রয়ে গেছে—যার মধ্যে আবেদন প্রত্যাখ্যান হওয়া ব্যক্তি এবং যারা কখনো বৈধতার আবেদনই করেননি, উভয়ই রয়েছেন।
গত ২১ আগস্ট শেষ হওয়া ইউএনইএফ-এর প্রথম বছরের কার্যক্রমে পুলিশ ৫,৩৯৭টি পরিদর্শন চালিয়ে ৫২,৪২১ জন বিদেশি নাগরিককে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এর ফলে ৮৩১ জনকে স্বেচ্ছায় দেশত্যাগের নোটিশ দেওয়া হয় এবং অবৈধভাবে বসবাসের দায়ে ২৮৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এ ছাড়া দেশটির বিমানবন্দরগুলোতে প্রায় ১ কোটি ৯৭ লাখ ৫০ হাজার যাত্রীকে পরীক্ষা করে জাল নথিপত্রসহ বিভিন্ন অপরাধে ৪২৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তবে এই অবৈধ অভিবাসীদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পর্তুগালের অস্থায়ী আটক কেন্দ্রের তীব্র সংকট। বর্তমানে দেশটিতে আশ্রয় বা বহিষ্কারাদেশের অপেক্ষায় থাকা অভিবাসীদের রাখার জন্য মাত্র ১৩০টি আসন রয়েছে, যা পোর্তো এবং লিসবন ও পোর্তো বিমানবন্দরের কয়েকটি কেন্দ্রে সীমাবদ্ধ। সংস্কার কাজের জন্য ফারো বিমানবন্দরের কেন্দ্রটি বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
গত শুক্রবার পর্তুগালের নতুন অভিবাসন আইন কার্যকর হওয়ার পর এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে। কারণ নতুন আইনে অভিবাসীদের সর্বোচ্চ ১৮০ দিন এবং প্রয়োজনে আরও ১৮০ দিন পর্যন্ত আটক কেন্দ্রে রাখার বিধান করা হয়েছে। পুলিশ প্রধান জানান, ইউরোপীয় তহবিল থেকে বরাদ্দ পাওয়া ৩ কোটি ইউরো (৩০ মিলিয়ন) হাতছাড়া হওয়ার পর লিসবন ও পোর্তোয় পরিকল্পিত দুটি ডিটেনশন সেন্টারের বিকল্প খুঁজছে সরকার। রিবেইরো স্পষ্ট করে বলেন, ‘আমি যদি তল্লাশি বাড়িয়ে অবৈধদের শনাক্ত করি, তবে তাদের আটকে রাখার মতো জায়গাও তো থাকতে হবে।’
এছাড়া তিনি জানান, জোরপূর্বক বিতাড়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর অসহযোগিতা এই ব্যবস্থার অন্যতম দুর্বলতা বা ‘অ্যাকিলিস হিল’। কিছু দেশ দ্রুত সাড়া দিলেও অনেক দেশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি তাদের নাগরিক কি না তা যাচাই করতেই চার মাস বা তার বেশি সময় পার করে দেয়। তাই পুলিশ জোরপূর্বক বিতাড়নের চেয়ে সহায়তাপ্রাপ্ত স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনকেই বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
এদিকে গত ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের যাত্রীদের জন্য বায়োমেট্রিক তথ্য (ছবি ও আঙুলের ছাপ) নেওয়া বাধ্যতামূলক করার পর ফারো বিমানবন্দরে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি হয়েছে, বিশেষ করে ব্রিটিশ যাত্রীবোঝাই বিমানগুলো একসাথে অবতরণ করলে সেখানে দীর্ঘ জট তৈরি হচ্ছে। লিসবন বিমানবন্দরেও অপেক্ষার সময় বেড়ে ১৫ থেকে ৩০ মিনিটে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে বিমানবন্দর নিরাপত্তা ও সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে পিএসপির ১,৫০৪ জন কর্মকর্তা নিয়োজিত রয়েছেন, যার মধ্যে লিসবনে ৭০৬ জন, পোর্তোয় ৩২৫ জন এবং ফারোতে ২১৫ জন দায়িত্ব পালন করছেন।


