পর্তুগালে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব এবার দেশটির পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় (সাপ্লাই চেইনে) পড়তে শুরু করেছে। পরিবহন সংস্থাগুলো ইতোমধ্যে পণ্য পরিবহনের ভাড়া বাড়াতে শুরু করেছে। ফলে আগামী এক মাসের মধ্যেই দেশটির সুপারমার্কেটগুলোতে জিনিসপত্রের দাম বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
‘ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অব পাবলিক রোড ফ্রেইট ট্রান্সপোর্টার্স’ (অ্যানট্রাম)-এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে পণ্য পরিবহনকারী কোম্পানিগুলোর মোট খরচের ৩০ থেকে ৪০ শতাংশই চলে যাচ্ছে জ্বালানি ক্রয়ে।
সমস্যাটি কেবল ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; তেলের দাম এত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে যে কোম্পানিগুলো আগামী কয়েক সপ্তাহের কাজের জন্য ঠিক কত ভাড়া নির্ধারণ করবে, তা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়ছে। অ্যানট্রামের মুখপাত্র আন্দ্রে মাতিয়াস দে আলমেইদা জানান, কিছু অপারেটরের জন্য ভাড়া বৃদ্ধি করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।
তিনি একটি বড় পরিবহন কোম্পানির উদাহরণ দিয়ে বলেন, প্রতিষ্ঠানটি আগে ১০ লাখ লিটার জ্বালানি কিনতে যেখানে প্রায় ১০ লাখ ইউরো খরচ করত, মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতের জেরে দাম বাড়ার পর সেই একই পরিমাণ তেলের জন্য এখন তাদের ২০ লাখ ইউরো গুনতে হচ্ছে।
পরিবহন খরচের এই বাড়তি চাপ খুব দ্রুতই সুপারমার্কেটের তাকগুলোতে পড়তে পারে। পর্তুগিজ অ্যাসোসিয়েশন অব ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানিজ (এপিইডি)-এর মহাপরিচালক গনসালো লোবো জাভিয়ের জানান, নতুন চুক্তি সম্পাদন এবং দোকানে নতুন চালানের পণ্য পৌঁছানোর সাথে সাথে আগামী প্রায় এক মাসের মধ্যে খুচরা মূল্যে এর প্রভাব দৃশ্যমান হতে পারে। সুপারমার্কেটগুলো সাধারণত আগে থেকেই পণ্য সংগ্রহ করে, তাই খামার ও উৎপাদকদের কাছ থেকে পরিবহন হয়ে খুচরা পর্যায়ে বাড়তি খরচের এই প্রভাব পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগে।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাংস ও ডিমের বাজার। কেবল জ্বালানির দামই নয়, বরং খাদ্যশস্য, সার এবং পশুখাদ্যের দাম বাড়ার কারণেও পোলট্রি ও প্রাণিজ আমিষের খাত তীব্র চাপের মুখে রয়েছে। এপিইডি জানিয়েছে, আগামী দিনগুলোতে আমিষজাতীয় পণ্যের দাম চড়া থাকার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে অ্যানট্রাম সতর্ক করেছে যে স্প্যানিশ পরিবহন অপারেটরদের তুলনায় পর্তুগিজ কোম্পানিগুলো তাদের প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা হারাচ্ছে। স্পেনে এখনো ডিজেলের ওপর বিশেষ সরকারি ভর্তুকি বহাল রয়েছে, অথচ পর্তুগালে প্রতি লিটার পেশাদার ডিজেলে ১০ সেন্ট ছাড় দেওয়ার সরকারি সুবিধাটি গত ৩০ জুনে শেষ হয়ে গেছে। অবশ্য পর্তুগাল সরকার জানিয়েছে, তারা পণ্য পরিবহন, ফায়ার সার্ভিস, সামাজিক খাত এবং ট্যাক্সিগুলোর জন্য এই সহায়তা পুনরায় চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সীমান্ত অঞ্চলে এই ব্যবধান সবচেয়ে বেশি স্পষ্ট; কারণ স্পেনের একটি ট্রাক নিজ দেশে ফুল ট্যাংক তেল ভরে পর্তুগালে পণ্য খালাস করে তেল না কিনে সরাসরি স্পেনে ফিরে যেতে পারছে।
উত্তর পর্তুগালের পরিবহন কোম্পানিগুলো চলতি সপ্তাহে আরেকটি নতুন সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। পোর্তো শহরের প্রধান সড়ক ‘ভিয়া দে সিন্তুরা ইন্তের্না’ (VCI)-তে সপ্তাহের কর্মদিবসে সকাল ৭টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ভারী পণ্যবাহী যান চলাচলে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। অ্যানট্রামের হিসাব অনুযায়ী, বিকল্প পথে চলার কারণে কোনো কোনো ট্রিপে অতিরিক্ত ৬০ কিলোমিটার পর্যন্ত ঘুরতে হচ্ছে, যা জ্বালানি খরচ ও সময় দুটোই আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এ নিয়ে ১৮০টিরও বেশি পরিবহন সংস্থার বৈঠকের পর তারা বিক্ষোভের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
পণ্য পরিবহনের পাশাপাশি গণপরিবহন খাতও তেলের এই তীব্র সংকটের মুখে পড়েছে। যাত্রীবাহী পরিবহন সংস্থাগুলোর সংগঠন ‘অ্যানট্রপ’ জানিয়েছে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে তেলের উচ্চমূল্যের কারণে এই খাতে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ (১৬ মিলিয়ন) ইউরোর ক্ষতি হবে। তবে তারা চাইলেই ভাড়া বাড়াতে পারছে না, কারণ গণপরিবহনের ভাড়া সরকার নিয়ন্ত্রিত। অ্যানট্রপ জানিয়েছে, কিছু অপারেটর কর্মীদের বেতন ও অন্যান্য খরচ মেটাতে ঋণ নিতে বাধ্য হচ্ছে।
সব মিলিয়ে আগামী মাসে সব পণ্যের দাম হয়তো হঠাৎ একলাফে আকাশচুম্বী হবে না, তবে পরিবহন ও উৎপাদন খরচের ক্রমবর্ধমান ধাক্কা যে খুচরা বাজারে পৌঁছে যাচ্ছে, তাতে মাংস ও ডিমের মতো পণ্যের দাম বৃদ্ধির স্পষ্ট আভাস মিলছে।


