আসন্ন শীতে গ্যাসের তীব্র সংকট এড়াতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য দেশগুলোকে গ্যাস ও বিদ্যুতের ব্যবহার কমানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে। ইউরোপীয় জ্বালানি কমিশনার ড্যান জোরগেনসেন দেশগুলোর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এই আহ্বান জানিয়েছেন। সংবাদমাধ্যম ‘ইউরোনিউজ’-এর দেখা ওই চিঠিতে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সদস্য দেশগুলোতে ভূগর্ভস্থ গ্যাসের মজুত বর্তমানে ‘অস্বাভাবিক রকমের কম’।
জোরগেনসেন লিখেছেন, ‘যতদিন প্রয়োজন ততদিন পর্যন্ত গ্যাস ও বিদ্যুতের চাহিদা কমাতে এবং মজুত স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য আমি আপনাদের অনুরোধ জানাচ্ছি।’ তিনি উল্লেখ করেন যে গত মার্চে দেওয়া তাঁর প্রথম সতর্কবার্তার পর থেকে সামগ্রিক পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি।
ট্রেড অ্যাসোসিয়েশন ‘গ্যাস ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইউরোপ’-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে ইইউর গ্যাস মজুতাগারগুলো মাত্র ৭০ শতাংশ পূর্ণ রয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ১২ শতাংশ পয়েন্ট কম। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) চালানের জন্য এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে বিশ্ববাজারে দাম হু হু করে বাড়ছে, যা ইউরোপে নতুন সরবরাহ সংকটের ঝুঁকি তৈরি করেছে।
ইউরোপীয় প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রধান বেঞ্চমার্ক ডাচ টিটিএফ (TTF)-এ বর্তমানে প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টা গ্যাস প্রায় ৭২ ইউরোতে বিক্রি হচ্ছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলা শুরু হওয়ার পর থেকে এই দাম মেগাওয়াট-ঘণ্টাপ্রতি ৪০ ইউরো বেড়েছে। বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এলএনজি রপ্তানি না বাড়লে কিংবা নরওয়েতে গ্যাস ফিল্ড সংস্কারের কাজ দীর্ঘায়িত হলে শীতের পিক মৌসুমে এই দাম ১০০ ইউরো ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ইইউর জ্বালানি প্রধান জানান, পিক আওয়ারে বা চাহিদার সর্বোচ্চ সময়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার কমালে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাস পোড়ানোর হার কমে আসবে, যা গ্যাসের মজুত ও দামের ওপর চাপ কমাবে। তিনি ২০২২ সালের জ্বালানি সংকটের সময় নেওয়া কৌশলগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দেন। যার মধ্যে ছিল—স্মার্ট মিটারের মাধ্যমে ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, সরকারি ভবনের তাপমাত্রা সীমিত রাখা, বাইরে হিটার ব্যবহার না করা এবং রাতে অপ্রয়োজনীয় সরকারি বাতি বন্ধ রাখা।
তবে জোরগেনসেন এখনই এসব বাধ্যতামূলক না করে দেশগুলোকে স্বেচ্ছায় সাশ্রয়ী পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘২০২২ সালের সংকটের সময় স্বেচ্ছাসেবী পদক্ষেপগুলো বেশ কার্যকর প্রমাণিত হয়েছিল এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারি।’
প্যানিক বায়িং বা আতঙ্কে বেশি দামে অতিরিক্ত গ্যাস কেনা এড়াতে সদস্য দেশগুলোকে নমনীয় হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন জোরগেনসেন। তিনি ৯০ শতাংশ মজুতের লক্ষ্যমাত্রায় আক্রমণাত্মকভাবে না ছুটে আপাতত ৮০ শতাংশ মজুতের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পরামর্শ দিয়েছেন। স্বাভাবিক সময়ে ভূগর্ভস্থ গ্যাস মজুত বেশি থাকা নিরাপত্তার প্রতীক হলেও, বিশ্ববাজারে সরবরাহ যখন কম তখন একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ গ্যাস কিনতে গেলে দাম আরও বেড়ে যেতে পারে। কমিশন মনে করছে, বর্তমান পরিস্থিতিতে শীতকালীন নিরাপত্তার জন্য ৮০ শতাংশ মজুতই যথেষ্ট হতে পারে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের আগের তুলনায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন বর্তমানে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় কিছুটা স্থিতিশীল অবস্থায় থাকলেও পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি বিপদমুক্ত নয়। ব্রাসেলস এখন আর কেবল উচ্চমূল্য থেকে ভোক্তাদের রক্ষার কথা বলছে না; বরং অতিরিক্ত ব্যবহারই যাতে সংকটের কারণ না হয়ে দাঁড়ায়, সেদিকে নজর দিচ্ছে।
চিঠিতে জোরগেনসেন বলেন, ‘আমরা মূলত একটি মূল্য সংকটের মুখোমুখি, যা একটি সরবরাহ সংকটের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।’ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো গ্যাস ঘাটতির ঝুঁকি না থাকলেও, আন্তর্জাতিক এলএনজি বাজার সংকীর্ণ থাকলে ইউরোপকে আসন্ন শীতে অনেক চড়া মূল্যে গ্যাস নিশ্চিত করতে হবে।
সাবস্ক্রাইব
নোটিসিয়াস বাংলায় প্রকাশিত সব খবর নিয়মিত জানতে সাবস্ক্রাইব করুন
রবিবার, ২৭ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ | ১২ই আশ্বিন, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
আরও খবর
আপনার মতামত দিন


