দালালের মাধ্যমে নয়, বাংলাদেশে থেকেই প্রশিক্ষণ নিয়ে বৈধভাবে ইতালি যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বাংলাদেশিদের জন্য। ইতালির শ্রম ও সামাজিক নীতি মন্ত্রণালয় অনুমোদিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সম্পন্ন করলে দেশটির প্রচলিত অভিবাসন কোটা ‘ডেকরেতো ফ্লাসি’র বাইরে থেকেও কাজের উদ্দেশ্যে ইতালিতে প্রবেশের সুযোগ মিলবে। এ প্রশিক্ষণের জন্য কর্মীদের কোনো খরচ বহন করতে হবে না। আবেদন করা যাবে বছরের যেকোনো সময়; এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো ‘ক্লিক ডে’ নেই।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) ঢাকার ঢাকা রিজেন্সি হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টে ‘ইতালিতে দক্ষ অভিবাসনের জন্য ভাষা, নাগরিক ও পেশাগত প্রশিক্ষণ’ শীর্ষক এক সেমিনারে এসব তথ্য জানানো হয়।
সেমিনারে জানানো হয়, বর্তমানে ইতালিতে ২ লাখ ১৭ হাজার বাংলাদেশি বৈধভাবে বসবাস করছেন। তাঁদের মধ্যে ৮০ হাজারের ওয়ার্ক পারমিট রয়েছে।
তিন বছরে প্রায় পাঁচ লাখ বিদেশি কর্মী নেবে ইতালি
সেমিনারে ইতালির সরকারি কর্মী নিয়োগের কোটা ব্যবস্থা ‘ডেকরেতো ফ্লাসি’র পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। এতে বলা হয়, ২০২৬ সালে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৮৫০ জন, ২০২৭ সালে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৮৫০ জন এবং ২০২৮ সালে ১ লাখ ৬৬ হাজার ৮৫০ জন বিদেশি কর্মী নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ইতালির। তিন বছরে মোট ৪ লাখ ৯৭ হাজার ৫৫০ জন কর্মী নেবে দেশটি।
বিভিন্ন দেশের জন্য নির্ধারিত কোটা অনুযায়ী এসব কর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। অনিয়মিত অভিবাসীদের দেশে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে সহযোগিতার কারণে বাংলাদেশের জন্যও নির্দিষ্ট কোটা রয়েছে।
তবে প্রচলিত কোটা ব্যবস্থার বাইরেও ইতালিতে কাজের সুযোগ তৈরি করেছে দেশটির অভিবাসন আইনের ‘আর্টিকেল ২৩’। এ ধারার আওতায় ইতালির শ্রম ও সামাজিক নীতি মন্ত্রণালয় অনুমোদিত ও সনদপ্রাপ্ত প্রি-ডিপারচার ট্রেনিং প্রজেক্ট সম্পন্নকারীরা ‘ডেকরেতো ফ্লাসি’র কোটা ছাড়াই বৈধভাবে দেশটিতে যাওয়ার সুযোগ পাবেন।
এ জন্য বাংলাদেশে থেকেই তিন ধরনের প্রশিক্ষণ নিতে হবে। এগুলো হলো প্রাথমিক ইতালীয় ভাষা শিক্ষা, ইতালি সম্পর্কে মৌলিক নাগরিক শিক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট পেশায় দক্ষতা অর্জন। প্রশিক্ষণের জন্য কর্মীদের কোনো অর্থ ব্যয় করতে হবে না।
অনুষ্ঠানে ফরম্যাটের প্রতিনিধি আন্তোনিও মিলো আর্টিকেল ২৩-এর পাঁচটি সুবিধা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, এ ব্যবস্থায় প্রচলিত কোটা ছাড়াই ইতালি যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রশিক্ষণ বিনামূল্যে দেওয়া হয় এবং শুরু থেকেই ইতালি সরকার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে। প্রশিক্ষণ শেষে কর্মীরা ইতালীয় ভাষা ও সংশ্লিষ্ট কাজ সম্পর্কে ধারণা নিয়ে দেশটিতে যেতে পারবেন। আর যারা শেষ পর্যন্ত ইতালি যাবেন না, তাঁরাও অর্জিত দক্ষতা বাংলাদেশে কাজে লাগাতে পারবেন।
ইতালি দূতাবাস জানায়, এ-সংক্রান্ত গাইডলাইন গৃহীত হয় ২০২৩ সালের ৭ জুলাই।
ভিসার খরচ নিয়ে সতর্কতা, দালালকে না বলার পরামর্শ
সেমিনারে ইতালি যাওয়ার নামে প্রতারণার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়। আয়োজকেরা জানান, ইতালির ভিসার সরকারি ফি ৫০ থেকে ১১৬ ইউরো। এর সঙ্গে ভিএফএসের ৩৮ ইউরো ফি যুক্ত হয়। সব মিলিয়ে সর্বোচ্চ খরচ ১৫৪ ইউরো। অথচ একই ভিসার জন্য দালালরা ১০ হাজার থেকে ১৫ হাজার ডলার পর্যন্ত নিচ্ছে। বিনিময়ে অনেক ক্ষেত্রে দেওয়া হচ্ছে ভুয়া কাগজপত্র ও মিথ্যা প্রতিশ্রুতি।
আয়োজকেরা বলেন, বৈধ পথে ইতালি যেতে তুলনামূলক কম খরচ হয়। প্রতারণার শিকার হওয়ার ক্ষেত্রে দালালদের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় অন্যতম কারণ। আর্টিকেল ২৩-এর আওতায় প্রশিক্ষণ নিতে কোনো খরচ হয় না। তাই দালালের ওপর নির্ভর না করে ইতালি দূতাবাস ও জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) বৈধ তথ্য অনুসরণের পরামর্শ দেওয়া হয়।
ইতালি পৌঁছানোর আট দিনের মধ্যে রেসিডেন্স পারমিটের আবেদন
ইতালিতে পৌঁছানোর আট দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে দেশটির পুলিশ সদর দপ্তর কুয়েশচুরায় গিয়ে রেসিডেন্স পারমিটের জন্য আবেদন করতে হবে। চুক্তির মেয়াদ অনুযায়ী সর্বোচ্চ দুই বছরের পারমিট দেওয়া হবে, যা নবায়নযোগ্য। দেশটিতে পাঁচ বছর বৈধভাবে বসবাসের পর স্থায়ী বা অনির্দিষ্ট মেয়াদের পারমিট পাওয়ার সুযোগ রয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, ইতালি যাওয়ার সময় কর্মীদের হাতে প্রবাসী কার্ড তুলে দেওয়ার চেষ্টা করা হবে। এর মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানো, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা এবং রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা হবে। দক্ষ কর্মী অভিবাসনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেড (বোয়েসেল)সহ সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও সহযোগিতা করবে।
তিনি বলেন, প্রশিক্ষণার্থীরা পাঁচ থেকে ছয় মাসের প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। এর মাধ্যমে বাংলা ও ইংরেজির বাইরে তৃতীয় ভাষা হিসেবে ইতালীয় ভাষায় দক্ষ হয়ে উঠছেন তাঁরা। সরকার এ প্রশিক্ষণ পদ্ধতিকে একটি মডেল হিসেবে বিবেচনা করছে। কারিকুলামটি টেকনিক্যাল ট্রেনিং সেন্টার ও ভোকেশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে যতটা সম্ভব চালুর চেষ্টা করা হবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ইতালি দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন ফেদেরিকো জাম্পারেলি। সূচনা বক্তব্য দেন ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডেপুটি হেড অব ডেলিগেশন বাইবা জারিনা। তিনি ইউরোপে নিরাপদ, বৈধ ও দক্ষ অভিবাসনের জন্য ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ নিয়ে আলোচনা করেন।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ইতালি দূতাবাসের মাইগ্রেশন অ্যাডভাইজার জিউসেপ্পে ডি জিওভান্নি। তিনি কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে ইতালিতে প্রবেশের বিধিমালা এবং নতুন আর্টিকেল ২৩-এর বিধান তুলে ধরেন। পরে এ ধারার আওতায় পরিচালিত কয়েকটি প্রকল্পের বিস্তারিত তুলে ধরেন ফরম্যাটের মাসিমিলিয়ানো ডি ফুসকো, ফ্রন্টিয়ার স্কিলসের আন্তোনিও মিলো এবং ইউপি রিক্রুটমেন্ট এজেন্সির ম্যানেজার এন্নিও মিলানো।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) হেড অব প্রোগ্রাম গুঞ্জন ডালাকোটি এবং বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) চিফ অব মিশন ড. লরা নিকোল টম-বন্ডে।
এতে সরকারি কর্মকর্তা ও গণমাধ্যম প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। দর্শক সারিতে ছিলেন আর্টিকেল ২৩-এর আওতায় প্রশিক্ষণ নেওয়া দুটি প্রকল্পের প্রশিক্ষণার্থীরা। ফ্রন্টিয়ার স্কিলসের ‘টিএএসটিই’ প্রকল্পের সম্ভাব্য অভিবাসীরা রেস্টুরেন্ট ও হসপিটালিটি খাতে ঢাকা রিজেন্সি হোটেলেই প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। অন্যদিকে ইতালির প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক প্রতিষ্ঠান ফরম্যাটের অধীনে টেক্সটাইল খাতের একদল প্রশিক্ষণার্থীও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।


