পশ্চিম আফ্রিকা থেকে নৌকায় করে অভিবাসী ও শরণার্থীদের আগমন বেড়ে যাওয়ায় স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের এল হিয়েরো দ্বীপে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি সামাল দিতে কেন্দ্রীয় সরকারের সহায়তা চেয়েছে তারা। চলতি নভেম্বরের প্রথম কয়েক দিনেই দ্বীপটিতে ৩ হাজার ৩০০ জনের বেশি অভিবাসী ও শরণার্থী পৌঁছেছেন। বিপুলসংখ্যক মানুষের সাময়িক আবাসনের ব্যবস্থা করতে হিমশিম খাচ্ছে স্থানীয় প্রশাসন।
শনিবার স্পেনের টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এল হিয়েরোর পরিচালনা পর্ষদের প্রধান আলপিদিও আরমাস বলেন, অল্প সময়ে এত বিপুলসংখ্যক অভিবাসীর আগমনে তারা অত্যন্ত উদ্বিগ্ন।
তিনি বলেন, উচ্চপর্যায়ের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় ও সহযোগিতার কাঠামো নিশ্চিত করতেই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয়েছে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বরের শুরু থেকে প্রায় ৩০টি নৌকায় করে ৩ হাজার ৩০০ জনের বেশি মানুষ দ্বীপটিতে পৌঁছেছেন। এল হিয়েরোর মোট জনসংখ্যা প্রায় ১১ হাজার ৪০০। অর্থাৎ মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে আসা অভিবাসী ও শরণার্থীর সংখ্যা দ্বীপটির মোট জনসংখ্যার প্রায় ২৯ শতাংশের সমান।
আলপিদিও আরমাস জানান, নতুন আসা মানুষদের জন্য অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তবে দ্বীপের হাসপাতালগুলোর পরিস্থিতি ইতোমধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের আঞ্চলিক সরকারের প্রধান ফার্নান্দো ক্লাভিহো শুক্রবার পরিস্থিতিকে ‘সম্পূর্ণ অসহনীয়’ বলে বর্ণনা করেন। বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে তিনি বলেন, অভিবাসীদের আগমনের বর্তমান হার ২০২৪ সালের রেকর্ডের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। কোনো কোনো দিন আগত মানুষের সংখ্যা আগের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
ক্লাভিহো আরও জানান, অভিবাসীদের পরিবহন ও ব্যবস্থাপনার কাজে গণপরিবহনের বাস ব্যবহার করতে হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অন্য দ্বীপগুলো থেকেও চিকিৎসাকর্মী আনা হচ্ছে।
ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের সামুদ্রিক উদ্ধার পরিষেবার তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বরের প্রথম ছয় দিনে দ্বীপপুঞ্জের উপকূল থেকে ৩ হাজার ২৬১ জন অভিবাসী ও শরণার্থীকে উদ্ধার করা হয়েছে।
প্রাণঘাতী সমুদ্রপথে বাড়ছে ঝুঁকি
পশ্চিম আফ্রিকা থেকে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানোর পথটি বিশ্বের অন্যতম প্রাণঘাতী অভিবাসন রুট হিসেবে পরিচিত। দীর্ঘ ও বিপজ্জনক এই সমুদ্রযাত্রায় প্রায়ই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি সপ্তাহে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জের উদ্দেশে যাত্রা করা একটি নৌকা থেকে দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। যাত্রাপথে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বেঁচে যাওয়া ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এ কথা জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি।
এ ছাড়া সাম্প্রতিক কয়েক সপ্তাহে দ্বীপপুঞ্জের আশপাশের সমুদ্রে অন্তত ৯ জন অভিবাসী ও শরণার্থীর মৃত্যু হয়েছে।
২০২৪ সালে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জে সমুদ্রপথে রেকর্ডসংখ্যক ৪৬ হাজারের বেশি অভিবাসী ও শরণার্থী পৌঁছেছিলেন। এরপর নজরদারি জোরদার এবং অভিবাসীদের উৎস ও যাত্রাপথের দেশগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোয় আগমনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসে।
স্পেনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সমুদ্রপথে ১৩ হাজার ৩২৭ জন অনিয়মিত অভিবাসী ও শরণার্থী দেশটিতে পৌঁছেছেন। গত বছরের একই সময়ের তুলনায় এ সংখ্যা ৫ দশমিক ৫ শতাংশ কম।
তবে সেনেগাল, মৌরিতানিয়া ও মরক্কোর উপকূলে নজরদারি ও টহল বাড়ানোয় অভিবাসীদের যাত্রাপথ আরও দক্ষিণে সরে গেছে। এখন গাম্বিয়া, গিনি-বিসাউ ও গিনি থেকে নৌকায় করে যাত্রা শুরু করছেন অনেকে। এতে সমুদ্রপথের দূরত্ব ও যাত্রার সময় বাড়ছে, সেই সঙ্গে বাড়ছে প্রাণহানির ঝুঁকিও।
এদিকে, সেনেগালের পুলিশ শনিবার জানিয়েছে, রাজধানী ডাকারের উপকূল থেকে ১৪২ জন অভিবাসীকে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছে।


