আকাশচুম্বী জ্বালানির দামের পেছনে থাকা আন্তর্জাতিক অস্থিরতা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন পর্তুগালের প্রধানমন্ত্রী লুইস মন্টেনেগ্রো। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, এর পরিণাম পর্তুগালের সাধারণ পরিবার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও দোকানগুলোতে চরমভাবে অনুভূত হচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির জেরে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ যখন রাজপথে আছড়ে পড়ছে, ঠিক তখনই প্রধানমন্ত্রী এই মন্তব্য করলেন।
গত রবিবার (১১ অক্টোবর) এই আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। এর মাত্র ২৪ ঘণ্টা আগে জীবনযাত্রার ব্যয় ও আবাসন সংকটের প্রতিবাদে দেশটির রাজপথে বিক্ষোভ করেন হাজার হাজার মানুষ। এরপর সোমবার সংসদ ভবনের সামনে কৃষকেরা অতিরিক্ত ১৪ কোটি ইউরো সহায়তার দাবি নিয়ে উপস্থিত হন। একই সঙ্গে জ্বালানি সংকটের কারণে পর্তুগিজ সামরিক বাহিনীর সরবরাহ চুক্তিতে অতিরিক্ত ৩০ লাখ ইউরোর বেশি খরচ বাড়ার তথ্যও সামনে এসেছে।
আভেইরো জেলার সাঁও জোয়াও দা মাদেয়ার শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় মন্টেনেগ্রো এই পরিস্থিতিকে ‘অর্থহীন’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের আগামী সপ্তাহগুলোতে, অদূর ভবিষ্যতে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে—এই অর্থহীন পরিস্থিতি, যার মাধ্যমে আমরা অর্থনীতি এবং সাধারণ মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করছি, অথচ কেউ লাভবান হচ্ছে না—এই অচলাবস্থা আমাদের ভাঙতে হবে।’
তিনি সতর্ক করে বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে পরিবহণ খরচ বেড়ে যাওয়ায় অন্যান্য পণ্যের দামও হু হু করে বাড়ছে। ভৌগোলিক রাজনৈতিক সংঘাত ও বাণিজ্য বিরোধকে এর জন্য দায়ী করে তিনি জানান, বিষয়টি তিনি জাতিসংঘ এবং ইউরোপীয় অংশীদারদের কাছে তুলে ধরেছেন।
লিটারে জ্বালানির দাম ছাড়াল ২ ইউরো
পর্তুগালের গাড়িচালকদের জন্য পরিস্থিতি কতটা সংকটজনক, তা জ্বালানির দাম থেকেই স্পষ্ট। গত সোমবার (১২ অক্টোবর) প্রকাশিত ইকো (ECO)-এর তথ্য অনুযায়ী, সরকারি কর সমন্বয়ের পরও ডিজেলের দাম প্রতি লিটার প্রায় ২.১৫ ইউরো এবং সাধারণ পেট্রলের দাম ২.১২ ইউরো ছাড়িয়ে গেছে।
এর মানে হলো, ৫০ লিটার তেল নিতে একজন চালককে ডিজেলের জন্য প্রায় ১০৭.৫০ ইউরো এবং পেট্রলের জন্য ১০৬.৩০ ইউরো গুনতে হচ্ছে। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে গণপরিবহন সীমিত এবং মানুষ যাতায়াতের জন্য ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরশীল, তাঁদের জন্য এই খরচ বহন করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
মূল্যস্ফীতি ঠেকাতে জ্বালানি করের (ISP) বিশেষ হ্রাস বহাল রেখেছে সরকার, যা চলতি বছরের শেষ পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা রয়েছে। তবে আবাসন খরচের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় মানুষের বাজেট সংকুচিত হয়ে পড়েছে। গত সেপ্টেম্বর মাসে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৩.৬ শতাংশে পৌঁছায়, আর চলতি বছর গড়ে মূল্যস্ফীতি ২.৯ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে সরকার।
‘এভাবে আর বাঁচা যায় না’—রাজপথে সাধারণ মানুষ
দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাত্রার ব্যয়ের প্রতিবাদে গত শনিবার (১০ অক্টোবর) পর্তুগালজুড়ে বিক্ষোভ করেন সাধারণ মানুষ। ‘না দা মাইস পারা ভিভের আসিম’ (আমরা এভাবে আর বাঁচতে পারছি না) প্ল্যাটফর্মের ডাকে এই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।
লিসবনের লারগো দো ইন্তেন্দেন্দে থেকে শুরু হয়ে বিক্ষোভ মিছিলটি আলমিমান্তে রেইস এভিনিউ ধরে প্রদক্ষিণ করে। লুসার প্রতিবেদন অনুযায়ী, পোর্তোয় প্রায় ১ হাজার ৫০০ মানুষ জমায়েত হন। এ ছাড়া আভেইরো ও ব্রাগাতেও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়।
বিক্ষোভকারীরা জানান, বাড়িভাড়া ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটাতেই তাদের পুরো বেতন শেষ হয়ে যাচ্ছে এবং তরুণ প্রজন্মের পক্ষে নিজেদের একটি আবাসনের ব্যবস্থা করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। ‘বেতন দিয়ে বেঁচে থাকা যায় না’—এমন স্লোগানও দেখা গেছে মিছিলে। আয়োজকরা নিত্যপণ্য ও জ্বালানির দাম নিয়ন্ত্রণ, বাড়িভাড়া বৃদ্ধির সীমা নির্ধারণ এবং ব্যাংক ও জ্বালানি খাতের অতিরিক্ত মুনাফার ওপর করারোপের দাবি জানিয়েছেন।
তবে প্রধানমন্ত্রী মন্টেনেগ্রো তাঁর বক্তব্যে শনিবারের বিক্ষোভের সরাসরি কোনো জবাব না দিলেও, পর্তুগালে অপ্রয়োজনীয় সামাজিক অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন। তিনি বলেন, ‘সমস্যার কথা বলা এক জিনিস, আর এখানে অপ্রয়োজনীয় অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে চাওয়া সম্পূর্ণ অন্য জিনিস।’ তিনি জোর দিয়ে বলেন, পর্তুগাল এখনও অর্থনৈতিক, আর্থিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার দেশ।
কৃষকদের আল্টিমেটাম ও সামরিক বাহিনীতে প্রভাব
জনগণের এই অসন্তোষ সোমবার সরাসরি এসে পৌঁছায় সংসদ ভবনের সামনে। কৃষি ও বন খাতকে রক্ষায় জরুরি সরকারের সহায়তা চেয়ে লিসবনে জড়ো হন প্রায় ১৫০ জন কৃষি নেতা।
পর্তুগিজ কৃষকদের কনফেডারেশন (সিএপি) ডিজেল, সার ও শক্তির আকাশচুম্বী খরচ মেটাতে অতিরিক্ত ১৪ কোটি ইউরো সহায়তা দাবি করেছে। সিএপির প্রেসিডেন্ট আলভারো মেনদোনকা ই মৌরা বলেন, তাঁরা কোনো অনুদান চাচ্ছেন না, বরং বিদেশি কৃষকদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার ন্যায্য সুযোগ চান। তিনি উল্লেখ করেন, স্প্যানিশ কৃষকেরা লিটারে ২০ সেন্ট সরকারি সহায়তা পেলেও পর্তুগালে তা মাত্র ১০ সেন্ট। এই ব্যবধান ছোট খামারগুলোর অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে।
এদিকে এই জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে পর্তুগিজ সশস্ত্র বাহিনীতেও। সিএনএন পর্তুগালের তথ্য অনুযায়ী, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর জ্বালানি সরবরাহের সংশোধিত চুক্তির মূল্য ৩০ লাখ ইউরোর বেশি বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বাধ্য হয়ে স্বীকার করেছে যে তাদের রুটিন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। নৌবাহিনীর সামুদ্রিক ডিজেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় চলতি বছর জ্বালানি খাতে তাদের প্রায় ৭৯ লাখ ইউরো প্রয়োজন হবে, যা সরকারের পূর্বে অনুমোদিত পরিমাণের চেয়ে ২৪ লাখ ইউরো বেশি।
সবশেষে দেশের অর্থনীতিকে ঘুরে দাঁড়ানোর তাগিদ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মন্টেনেগ্রো বলেন, ‘আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে, এই কঠিন পরিস্থিতির মুখে দৃঢ় থাকতে হবে।’


