ফিনল্যান্ড সরকার নাগরিকত্ব অর্জনের নিয়মে বড় পরিবর্তন এনেছে। নতুন আইনে এখন থেকে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করতে হলে দেশটিতে অন্তত আট বছর বৈধভাবে বসবাস করতে হবে, আগের নিয়মে যা ছিল পাঁচ বছর।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য হলো বাস্তবিকভাবে ফিনল্যান্ডের সমাজে একীভূত ব্যক্তিদের নাগরিকত্ব প্রদান করা, শুধুমাত্র দীর্ঘ সময় ধরে বসবাস করছে এমন অভিবাসীদের নয়।
নতুন নিয়মে যা থাকছে
ফিনল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয় ২০২৪ সালের অক্টোবর থেকে নাগরিকত্ব আইনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী কার্যকর করেছে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো-
- আগে টানা ৫ বছর বৈধভাবে বসবাস করলেই নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করা যেত, এখন তা বাড়িয়ে ৮ বছর করা হয়েছে।
- ফিনিশ বা সুইডিশ ভাষায় মৌলিক দক্ষতার সার্টিফিকেট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
- আবেদনকারীর মাসিক আয় বা জীবিকার উৎস যাচাই করবে অভিবাসন বিভাগ। সামাজিক ভাতা বা সরকারি সাহায্যের উপর নির্ভরশীল থাকলে আবেদন বাতিল হতে পারে।
- আবেদনকারী ফিনল্যান্ডে নিয়মিতভাবে অবস্থান করছেন কিনা এবং অনুমোদনহীন সময় বা দেশে বাইরে কাটানো দিনের সংখ্যা কত, তা গুরুত্বসহকারে দেখা হবে।
- এছাড়া কোনো ধরনের অপরাধমূলক রেকর্ড থাকলে আবেদন বিলম্বিত বা বাতিল হতে পারে।
ফিনল্যান্ড সরকার মনে করে, নাগরিকত্ব কোনো স্বয়ংক্রিয় অধিকার নয়, বরং এটি দেশের প্রতি দায়িত্ব ও সমাজে একীভূত হওয়ার প্রতিশ্রুতি। এ বিষয়ে অভ্যন্তরীণ মন্ত্রী মারিয়া ওহিসালো জানান…
আমরা এমন নাগরিক চাই যারা ফিনল্যান্ডের সমাজ, ভাষা ও সংস্কৃতির অংশ হতে আগ্রহী। যারা এখানে শুধু সুবিধা নিতে নয়, অবদান রাখতে এসেছে।
নতুন আইনে বিশেষভাবে বলা হয়েছে, যদি কোনো আবেদনকারী নিয়মিতভাবে সামাজিক সহায়তা বা সরকারি ভাতা গ্রহণ করেন, তাহলে তাকে আর্থিকভাবে স্বনির্ভর নন বলে বিবেচনা করা হতে পারে। অন্যদিকে যাদের স্থায়ী চাকরি, ব্যবসা বা কর প্রদানের প্রমাণ রয়েছে, তাদের আবেদন প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।
ফিনল্যান্ডের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এই উদ্যোগের লক্ষ্য হলো এমন নাগরিক তৈরি করা যারা অর্থনৈতিকভাবে সমাজে ইতিবাচক অবদান রাখে।
নাগরিকত্বের অন্যতম শর্ত হচ্ছে ভাষা দক্ষতা। ফিনিশ বা সুইডিশ ভাষায় প্রাথমিক পর্যায়ের দক্ষতা অর্জনের জন্য আবেদনকারীদের সাধারণ ভাষা দক্ষতা পরীক্ষায় পাস করতে হয়। এছাড়া স্থানীয় সংস্কৃতি, সামাজিক মূল্যবোধ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কিত মৌলিক জ্ঞান থাকা এখন একটি পরোক্ষ শর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
হেলসিঙ্কি ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক টুয়োমাস সালমিনেন বলেন…
নাগরিকত্ব শুধু পাসপোর্ট নয়, এটি সমাজে অন্তর্ভুক্তির প্রতীক। ভাষা ও সংস্কৃতিতে সংযুক্ত না হলে সেই অন্তর্ভুক্তি বাস্তবায়িত হয় না।
প্রবাসীদের সামনে চ্যালেঞ্জ
এই নতুন নিয়ম অভিবাসী ও বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে…
- দীর্ঘ সময় (৮ বছর) বৈধভাবে বসবাস বজায় রাখা।
- ভাষা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার চাপ।
- স্থায়ী চাকরি বা আয়ের প্রমাণ দেখানো।
- বিদেশে অবস্থানের সীমা মেনে চলা।
- কোনো সামাজিক সহায়তার ওপর নির্ভর না করা।
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রবাসীদের জন্য এটি বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং, কারণ তাদের অনেকেই পড়াশোনা বা অস্থায়ী কাজের ভিসায় ফিনল্যান্ডে অবস্থান করে থাকেন।
নাগরিকদের প্রতিক্রিয়া
ফিনল্যান্ডে বসবাসরত অভিবাসীরা মিশ্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। হেলসিঙ্কিতে বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসী আমিনুল ইসলাম বলেন…
আমরা আইন মানি, ট্যাক্স দিই, এখানে জীবন গড়ি। তবুও ৮ বছরের অপেক্ষা অনেক দীর্ঘ মনে হয়।
অন্যদিকে স্থানীয় নাগরিকদের একাংশ মনে করেন, এই পদক্ষেপ দেশের নিরাপত্তা ও সামাজিক সংহতির জন্য প্রয়োজনীয় ছিল।
পরিসংখ্যান ও প্রেক্ষাপট
২০২৩ সালে ফিনল্যান্ডে প্রায় ১২,০০০ নাগরিকত্বের আবেদন জমা পড়ে, এর মধ্যে প্রায় ৮০ শতাংশ আবেদনই অভিবাসীদের কাছ থেকে আসে। নতুন আইনের কারণে ২০২৫ সাল থেকে এই সংখ্যা কিছুটা হ্রাস পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ফিনল্যান্ড ইউরোপের সবচেয়ে সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল দেশগুলোর একটি। তবে একইসাথে দেশটি চায়, তার নাগরিকরা হোক স্থায়ী, আত্মনির্ভর ও ফিনিশ সমাজের সাথে ওতপ্রোতভাবে সংযুক্ত মানুষ। নতুন আইন তাই একদিকে কঠোরতা, অন্যদিকে মানসম্মত নাগরিকত্বের দিকেও এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া।
ফিনল্যান্ডে নাগরিকত্ব পেতে এখন শুধু সময় নয়, প্রয়োজন ভাষা, দক্ষতা ও দায়িত্ববোধের প্রমাণ। অভিবাসীদের জন্য এটি একটি চ্যালেঞ্জ হলেও, যারা দেশটিকে দ্বিতীয় নিবাস হিসেবে দেখতে চান, তাদের জন্য এটি হতে পারে ভবিষ্যতের স্থায়ী বসবাসের সুযোগ।
