ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বেশ কিছু নাগরিকের ব্রেক্সিট-পরবর্তী আবাসিক অধিকার বা থাকার অধিকার কেড়ে নেওয়া শুরু করেছে যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (হোম অফিস)। এই পদক্ষেপটি ইউরোপের সাথে যুক্তরাজ্যের ‘উইথড্রয়াল এগ্রিমেন্ট’ বা প্রত্যাহার চুক্তির পরিপন্থী কি না, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাজ্যের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বিষয়ক কর্তৃপক্ষ ইতিমধ্যে অন্তত ১০০ জন নাগরিককে জানিয়েছে যে, তাদের ‘ভুলবশত’ আবাসিক অধিকার দেওয়া হয়েছিল। পাঁচ বছর মেয়াদি অস্থায়ী থাকার অনুমতি ‘প্রি-সেটেল্ড স্ট্যাটাস’ শেষে যখন তাঁরা স্থায়ীভাবে থাকার অনুমতি ‘সেটেল্ড স্ট্যাটাস’-এ উন্নীত করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, ঠিক তখনই এই সিদ্ধান্ত তাদের জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা সংস্থা ‘এনএইচএস’-এ কর্মরত এবং পিএইচডি গবেষণারত এক পর্তুগিজ নারী জানিয়েছেন, হোম অফিস থেকে তাঁকে যখন জানানো হয় যে ভুলবশত তাঁকে ব্রেক্সিট-পরবর্তী থাকার অধিকার দেওয়া হয়েছিল, তখন থেকে তাঁর জীবন এক অনিশ্চয়তায় মোড় নিয়েছে।
যুক্তরাজ্য ইইউ ত্যাগ করার আগে পাঁচ বছরের কম সময় সে দেশে থাকা অন্য ১.৩ মিলিয়ন (১৩ লাখ) মানুষের মতো তাঁকেও ইইউ সেটেলমেন্ট স্কিমের অধীনে এই প্রি-সেটেল্ড স্ট্যাটাস বা থাকার অস্থায়ী অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তিনি আশা করেছিলেন যে কোনো সমস্যা ছাড়াই এটি স্থায়ী সেটেল্ড স্ট্যাটাসে রূপান্তরিত হবে। কিন্তু হোম অফিস যখন তাঁকে জানায় যে তাঁর এই থাকার অনুমতিটি আসলে একটি ‘ভুল’ ছিল, তখন তিনি চরমভাবে ভেঙে পড়েন।
নিরাপত্তার স্বার্থে ছদ্মনাম ব্যবহার করা গ্যাব্রিয়েলা বলেন, ‘আমি চরমভাবে বিপর্যস্ত বোধ করছি, কারণ এই সিদ্ধান্তটি আমার জীবনের অনেক ক্ষেত্রকে প্রভাবিত করতে যাচ্ছে।’ তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, যুক্তরাজ্যে আইনগতভাবে থাকার মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তাঁকে এক বৈরী পরিবেশের মুখোমুখি হতে হবে।
গ্যাব্রিয়েলা বলেন, ‘আমি আমার চাকরি হারাতে পারি, এমনকি আমি এখন যে বাড়িতে বাস করছি তা ভাড়া নেওয়ার অধিকারও আমার থাকবে না। কারণ স্বভাবতই বাড়িওয়ালার কাছে আমাকে প্রমাণ করতে হবে যে এ দেশে থাকার আইনি অধিকার আমার আছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার ব্যাংক অ্যাকাউন্টও বন্ধ বা প্রভাবিত হতে পারে। আমি এনএইচএস-এ কাজ করি এবং অন্য কয়েকটি অস্ত্রোপচার দপ্তরেও যুক্ত রয়েছি। ফলে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় আমার চুক্তিভিত্তিক কাজ রয়েছে এবং এটি বাতিল হলে আমার কী অবস্থা হবে, আমি জানি না। এটি অত্যন্ত মানসিক চাপের সৃষ্টি করছে।’
ব্রেক্সিট কার্যকরের আগে যুক্তরাজ্যে পাঁচ বছরের কম সময় থাকার কারণে আইনগতভাবে থাকার জন্য যে ১০ লাখেরও বেশি ইইউ নাগরিককে প্রি-সেটেল্ড স্ট্যাটাস দেওয়া হয়েছিল, গ্যাব্রিয়েলা তাঁদেরই একজন।
হোম অফিস এখন শিশু, নন-ইউরোপীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল (ইইএ) ভুক্ত নাগরিক এবং ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বরের পর আগমনকারী ব্যক্তিবর্গসহ যাদের মর্যাদা পূর্ণ ‘সেটেল্ড স্ট্যাটাস’-এ উন্নীত করা প্রয়োজন, তাঁদের সবার মামলার নতুন করে পর্যালোচনা করছে।
কতজন মানুষকে এ সংক্রান্ত চিঠি পাঠানো হয়েছে, তা হোম অফিস জানাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে তথ্য অধিকার (এফওআই) আবেদনের মাধ্যমে অধিকার রক্ষা বিষয়ক সংগঠন ‘দ্যথ্রিমিলিয়ন’ জানতে পেরেছে যে, কেবল গত মার্চ মাসেই ৯৫ জনকে এমন চিঠি পাঠানো হয়েছে।
গ্যাব্রিয়েলা মূলত একজন ব্রাজিলীয়-পর্তুগিজ নাগরিক। তবে আবেদনের সময় তাঁর কাছে পর্তুগিজ পাসপোর্ট ছিল না, যা এখন হোম অফিসের তদন্তের মুখে পড়েছে।
পাঁচ পৃষ্ঠার এক দীর্ঘ চিঠিতে হোম অফিস জানিয়েছে: ‘আমাদের নজরে এসেছে যে, ২০২০ সালের ৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাতের আগে (যখন যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউর সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে) আপনি যে একজন ‘প্রাসঙ্গিক ইইএ নাগরিক’, তা নিশ্চিত করার মতো প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই আপনাকে প্রি-সেটেল্ড স্ট্যাটাস দেওয়া হয়েছিল।’
চিঠিতে আরও বলা হয়, ‘বর্তমানে লভ্য তথ্য এবং প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে তাই মনে করা হচ্ছে যে, আপনার প্রি-সেটেল্ড স্ট্যাটাসটি আসলে ভুলবশত দেওয়া হয়েছিল।’
গ্যাব্রিয়েলা অবশ্য দাবি করেছেন যে, তিনি হোম অফিসের কাছে কোনো তথ্য লুকাননি এবং তাঁর বাবা পর্তুগিজ হওয়ায় তিনি জন্মসূত্রে ইইউর নাগরিক। তিনি বলেন, ‘নাগরিকত্ব জন্মসূত্রে পাওয়া যায়, তাই এটি এমন কিছু নয় যা আমার জন্মের পর পরিবর্তিত হয়েছে।’
দ্যথ্রিমিলিয়নের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী মোনিক হকিন্স বলেছেন, হোম অফিসের এই পেছনের ফাইল ঘেঁটে পর্যালোচনার প্রভাব অনেকের জন্য মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে এনেছে।
সংগঠনটি এ ধরনের ডজনখানেক মামলার কথা জানতে পেরেছে, তবে তাদের আশঙ্কা—গ্যাব্রিয়েলার মতো শত শত বা হাজার হাজার মানুষ এ ধরনের চিঠির সম্মুখীন হতে পারেন যা তাঁদের যুক্তরাজ্য থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
হকিন্স বলেন, ‘মানুষ সরল বিশ্বাসে ইইউ সেটেলমেন্ট স্কিমে আবেদন করেছিলেন এবং বছরের পর বছর আগে হোম অফিস তাঁদের সেই মর্যাদা দিয়েছিল। তাঁরা সেই সিদ্ধান্তের ওপর ভিত্তি করেই সরল বিশ্বাসে যুক্তরাজ্যে নিজেদের জীবন গড়ে তুলেছেন এবং এখানে বসতি স্থাপন করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এমন অনেক মানুষের কথা শুনছি যারা নিজেদের চাকরিতে উন্নতি করছেন, যাদের সন্তানরা এখানে পড়াশোনা করছে এবং তারা অন্য কোনো দেশকে নিজের বলে জানেই না। অথচ পাঁচ বছর পর যখন তারা স্থায়ী সেটেল্ড স্ট্যাটাসের জন্য আবেদন করছে, তখন তাদের বলা হচ্ছে যে এটি একটি ভুল ছিল। কোথাও একটি জীবন গড়ে তোলার পর যদি এভাবে সবকিছু কেড়ে নেওয়া হয়, তবে কেমন লাগতে পারে তা কল্পনা করুন।’
গ্যাব্রিয়েলা হোম অফিসের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করছেন। তবে এই ‘ভুলবশত’ আবাসিক অধিকার দেওয়ার বিষয়টি ইন্ডিপেনডেন্ট মনিটরিং অথরিটি (আইএমএ)-এর কাছেও বড় সতর্কসংকেত হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই সংবিধিবদ্ধ সংস্থাটি ইইউ-যুক্তরাজ্য প্রত্যাহার চুক্তির অধীনে ইইউ নাগরিকদের আইনি সুরক্ষার বিষয়টি তদারকি করে থাকে।
এক বিবৃতিতে সংস্থাটি জানিয়েছে, ‘তারা হোম অফিসের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যে এই নীতিটি ইইউ প্রত্যাহার চুক্তির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।’
হকিন্স বলেন, প্রত্যাহার চুক্তি অনুযায়ী থাকার মর্যাদা ‘কেবল তখনই বাতিল করা যেতে পারে যখন তা করা অত্যন্ত যৌক্তিক ও আনুপাতিক হবে’। কিন্তু তাঁর মতে, ‘হোম অফিস স্রেফ এটিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করছে।’ তিনি এই পদ্ধতিটিকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ বলে অভিহিত করেছেন এবং হোম অফিসকে এই নীতি পুনর্বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়েছেন।
হোম অফিস জানিয়েছে, ব্যক্তিগত কোনো মামলার বিষয়ে নিয়মিত মন্তব্য না করা তাদের দীর্ঘদিনের নীতি।
তারা বলেছে, যেসব নাগরিককে ভুলবশত মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল বলে তারা মনে করে, তারা চাইলে অন্যান্য ভিসা বা অভিবাসন রুটের মাধ্যমে থাকার জন্য আবেদন করতে পারেন।
হোম অফিস আরও যোগ করেছে যে, তারা সংশ্লিষ্ট নাগরিকদের প্রি-সেটেল্ড স্ট্যাটাসের মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত থাকার অনুমতি দেবে, যার মধ্যে তারা বিকল্প ব্যবস্থা খুঁজতে পারবেন। এ ছাড়া তারা সম্পূর্ণ সেটেল্ড স্ট্যাটাসের জন্যও আবেদন করতে পারেন এবং তা প্রত্যাখ্যান করা হলে আইনগতভাবে আপিল করতে পারবেন।
দ্য গার্ডিয়ান


