ফ্রান্সের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের লর্ড চ্যান্সেলর শাবানা মাহমুদের ‘ওয়ান ইন, ওয়ান আউট’ (একজনের বদলে একজন) চুক্তির আওতায় প্রায় ১০০ শিশুকে ভুলবশত প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে চিহ্নিত করে বন্দিশালায় আটকে রাখা হয়েছে। গার্ডিয়ানের এক অনুসন্ধানে এই তথ্য উঠে এসেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (হোম অফিস) কর্মীরা জানিয়েছেন, গত ৯ মাসে এই চুক্তির আওতায় বয়স নিয়ে বিতর্ক থাকা ৩০৪টি মামলার মধ্যে ৯৪টি (৩১ শতাংশ) ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত সংশ্লিষ্টরা ‘শিশু’ বা অপ্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে। সরকারি নীতি অনুযায়ী এই চুক্তি থেকে শিশুদের বাদ রাখার কথা এবং অভিভাবকহীন শিশুদের অভিবাসন বন্দিশালায় ২৪ ঘণ্টার বেশি আটকে রাখার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
কারাগার ও অভিবাসন বন্দিশালাগুলো পর্যবেক্ষণকারী স্বাধীন সংস্থা ‘ইন্ডিপেন্ডেন্ট মনিটরিং বোর্ডস’ (আইএমবি)-এর অন্তর্বর্তীকালীন চেয়ারপারসন জেন লিচ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অ্যানা টার্লিকে পাঠানো এক চিঠিতে এই পরিসংখ্যান তুলে ধরেছেন।
অত্যন্ত সমালোচনামূলক ওই চিঠিতে জেন লিচ আরও উল্লেখ করেছেন যে, এই চুক্তির আওতায় আটককৃত কিছু ব্যক্তির ক্ষেত্রে:
বহিষ্কারের অপেক্ষায় থাকা ব্যক্তিদের ‘কেবল ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে’ সর্বোচ্চ ২৮ দিন আটকে রাখার নিয়ম থাকলেও, অনেককে ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে বন্দি রাখা হয়েছে।
যক্ষ্মায় আক্রান্ত বা হাসপাতালে চিকিৎসার প্রয়োজন—এমন ব্যক্তিদেরও ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল।
একসাথে ভ্রমণ করা পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে অনেককে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছিল, যা অত্যন্ত ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে।
গত বছরের আগস্টে চালু হওয়া ‘ওয়ান ইন, ওয়ান আউট’ বা ‘অপারেশন হিলমোর’ কর্মসূচির আওতায় ছোট নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে আসা অভিবাসীদের একটি অংশকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানোর সুযোগ পায় যুক্তরাজ্য। এর বিপরীতে বৈধ দাবি রয়েছে—এমন সমসংখ্যক অভিবাসীকে ফ্রান্স থেকে গ্রহণ করতে রাজি হয় ব্রিটেন।
জেন লিচ বলেন, এই চুক্তির কারণে ‘শিশু এবং নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিসহ সদ্য আসা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মানুষদের বন্দিশালায় রাখা হচ্ছে।’
মন্ত্রীকে লেখা চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা আইএমবি-কে জানিয়েছেন যে, ২০২৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১ মে পর্যন্ত ৩০৪টি বয়সজনিত বিরোধের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ৯৪ জনকে (৩১ শতাংশ) শিশু হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।’ তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থাটি অকার্যকর এবং বয়স নিয়ে সন্দেহ থাকলে শুরুতেই যেন তাদের বন্দি করা না হয়, তা নিশ্চিত করতে আরও পদক্ষেপ নেওয়া দরকার।
কর্মকর্তাদের বয়স নির্ধারণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় নেওয়ারও সমালোচনা করেন লিচ। হিথরো বোর্ডের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, অভিবাসন কেন্দ্রে পৌঁছানোর পর বয়স নির্ধারণ করতে ৪০ দিন বা তারও বেশি সময় লেগেছে।
চিঠিতে লিচ আরও বলেন, ‘সদ্য আসা এই মানুষদের অনেকেই মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তাদের মধ্যে অনেকেই নির্যাতন ও সহিংসতার শিকার।’ ম্যানস্টন অভিবাসন কেন্দ্রে স্বাস্থ্য পরীক্ষা অত্যন্ত দুর্বল ছিল উল্লেখ করে তিনি জানান, গ্যাটউইক অভিবাসন কেন্দ্রে যক্ষ্মা আক্রান্ত এক ব্যক্তিকে পাঠানো হয়েছিল এবং ব্রুক হাউসে আরেকজনের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাকে সরাসরি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। দ্রুত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা থাকলেও একজনকে ২৭ সপ্তাহ বা প্রায় সাত মাস বন্দি রাখার প্রমাণ মিলেছে।
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৪ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত এই চুক্তির অধীনে ১,০৮৭ জনকে ফ্রান্সে ফেরত পাঠানো হয়েছে। একই সময়ে ২৭,৯২০ জন অভিবাসী ছোট নৌকায় করে যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছেন।
রিফিউজি কাউন্সিলের বাহ্যিক সম্পর্ক বিষয়ক নির্বাহী পরিচালক ইমরান হুসাইন এই পরিসংখ্যানকে ‘উদ্বেগজনক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, হোম অফিস কর্তৃক শিশুদের ভুলভাবে প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে বিবেচনা করার এটি সর্বশেষ উদাহরণ। তিনি বলেন, ‘প্রায়শই শরণার্থী শিশুদের প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে গণ্য করে অনিরাপদ পরিস্থিতিতে ফেলা হচ্ছে, যেখানে তারা অবহেলা ও নির্যাতনের ঝুঁকিতে পড়ছে।’ তিনি বয়স নির্ধারণের জন্য প্রশিক্ষিত সামাজিক কর্মীদের মাধ্যমে পেশাদার মূল্যায়নের দাবি জানান।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র বলেন, ‘সীমান্তের সততা বজায় রাখতে এবং অভিবাসীদের উপযুক্ত সুরক্ষা ও সেবা নিশ্চিত করতে সঠিক বয়স নির্ধারণ করা জরুরি। আমরা এই প্রক্রিয়াটিকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করব, যার অংশ হিসেবে আগামী বছর থেকে বয়স নির্ধারণে অত্যাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।’


