গ্রিসে অস্তিত্বহীন হাজার হাজার গবাদিপশুর নাম ব্যবহার করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) দেওয়া কোটি কোটি ইউরোর কৃষি ভর্তুকি বা তহবিল আত্মসাতের এক চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘পলিটিকো’-র সরকারি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশটির সরকারি নথিতে যত পশুর উল্লেখ রয়েছে, তার চেয়ে অনেক বেশি পশুর নামে ইইউর কাছ থেকে ভর্তুকি দাবি করেছেন গ্রিসের কৃষকেরা।
এই চাঞ্চল্যকর আবিষ্কার গ্রিসের সাম্প্রতিক কৃষি ভর্তুকি কেলেঙ্কারিকে আরও বড় এবং বিতর্কিত করে তুলেছে।
এই কেলেঙ্কারি ফাঁসের পর এথেন্স সরকার কৃষি খাতে দুর্নীতি দমন ও তদারকি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। গত জুনে এক সংবাদ সম্মেলনে দেশটির কৃষিমন্ত্রী মার্গারিটিস শিনাস বলেছিলেন, ‘গ্রিসের গবাদিপশু খামার খাত একটি নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। এটি ইইউর প্রতি দেওয়া তার প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণ করছে এবং এমন এক যুগে প্রবেশ করছে যা সুনির্দিষ্ট নিয়ম, স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা দ্বারা পরিচালিত হবে।’
কিন্তু পলিটিকোর সংগৃহীত উপাত্ত ও সরকারি পরিসংখ্যানের মধ্যকার বিশাল অসঙ্গতি ইঙ্গিত করে যে, এই খাতের দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকারকে এখনও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে।
গ্রিসের কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে অন্তত ২ লাখ ৬০ হাজার ‘দুধ দেওয়া গাভী’র জন্য ইইউর কাছ থেকে বড় অঙ্কের আর্থিক ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। পলিটিকো কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করে এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করেছে।
যেহেতু একটি দুধ দেওয়া গাভী সাধারণত বছরে একটি বাছুর জন্ম দেয়, তাই স্বাভাবিক নিয়মেই দেশের মোট গরুর সংখ্যা সমপরিমাণ বাছুর যোগ হয়ে বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। এছাড়া ২০২৪ সালে প্রায় ৭০,০০০ গবাদিপশু মাংসের জন্য জবাই করা হয়েছিল, যা আলাদাভাবে ইইউ ভর্তুকির আওতাভুক্ত।
গ্রিসে সাধারণত বার্ধক্য বা রোগের কারণে কত পশু খামার থেকে বাদ দেওয়া হয়, তার কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করা হয় না। তবে তিনজন স্থানীয় খামারি পলিটিকোকে জানিয়েছেন, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২০ শতাংশ পশু খামার থেকে বাদ দিতে হয়। গ্রিসের পরিসংখ্যান সংস্থা ‘এলস্ট্যাট’-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশে মোট ৬ লাখ গবাদিপশু ছিল, যার ২০ শতাংশ বাদ দিলে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার পশু কমে যাওয়ার কথা।
এই হিসাব অনুযায়ী, বাছুর জন্ম নেওয়া এবং জবাই হওয়ার অনুপাত মেলালে ২০২৪ সালে গ্রিসের মোট পশুর সংখ্যা আগের বছরের চেয়ে প্রায় ৭০,০০০ বৃদ্ধি পাওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু এলস্ট্যাটের বার্ষিক সমীক্ষা বলছে সম্পূর্ণ বিপরীত কথা। সরকারি হিসাবে দেশের গবাদিপশুর সংখ্যা দিন দিন কমছে। ২০২৩ সালে দেশে গরুর সংখ্যা যেখানে ছিল ৬ লাখ ৪০ হাজার, ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৬ লাখে এবং ২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যে তা আরও কমে মাত্র ৫ লাখ ২০ হাজারে নেমে এসেছে।
কাভালা লাইভস্টক ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নিকোস ডিমোপোলোস বলেন, এই হিসাবের অসঙ্গতি আসলে আরও অনেক বড়। মাংসের জন্য জবাই করা অনেক পশুই মূলত বিদেশ থেকে আমদানি করা হয়েছিল, যা দেশের নিজস্ব পশুর হিসাবের বাইরে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘এখানে কোনো তদারকি নেই এবং আমাদের কাছে নিখুঁত কোনো ডেটা না থাকায় আমরা সঠিক সংখ্যাটি কখনই জানতে পারছি না।’ প্রশাসন কেবল কোনো আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পেলেই মাঝেমধ্যে নামমাত্র তদন্ত করে থাকে।
একই ধরনের বড় অসঙ্গতি দেখা গেছে ভেড়া ও ছাগলের সরকারি রেকর্ডেও। এলস্ট্যাটের হিসাব অনুযায়ী ২০২৫ সালে দেশে মোট ৮৮ লাখ ভেড়া ও ছাগল ছিল, অথচ সরকারের নিজস্ব ইন্টিগ্রেটেড ভেটেরিনারি ইনফরমেশন সিস্টেমের ডেটাবেসে ১ কোটি ৫৭ লাখ ভেড়া ও ছাগল নিবন্ধিত রয়েছে!
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কৃষি মন্ত্রণালয়ের দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গবাদিপশুর হিসাব রাখার দায়িত্ব সরাসরি তাঁদের নয়, বরং এটি স্থানীয় পৌরসভাগুলোর সরবরাহ করা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে পশুসম্পদ ও ভর্তুকি প্রদানের জন্য কোনো নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য কেন্দ্রীয় ডেটাবেস বা রেজিস্ট্রি নেই।
এই জালিয়াতির বিরুদ্ধে ইউরোপীয় পাবলিক প্রসিকিউটরস অফিসে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জমা দিয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী অ্যালেক্সিস সিপ্রাসের নেতৃত্বাধীন বামপন্থী ‘এলাস’ পার্টি। দলটির কৃষি নীতি বিভাগের প্রধান থমাস মসকোস বলেন, ছোট খামারিদের সংগঠন ‘অ্যাসোসিয়েশন অব কাস্তোরিয়া’ ইতিমধ্যেই ইউরোপীয় তদন্ত সংস্থার কাছে প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দিয়েছে।
ইউরোপীয় তদন্ত সংস্থাটি ইতিমধ্যেই গ্রিসে ইইউ কৃষি তহবিলের কোটি কোটি ইউরো আত্মসাতের কয়েক ডজন মামলা খতিয়ে দেখছে। এর মধ্যে এমন অনেক ব্যক্তি রয়েছেন যারা নিজেদের মালিকানাধীন বা লিজ নেওয়া জমি ছাড়াই কেবল ভুয়া খামার দেখিয়ে ইইউ তহবিল তুলে নিয়েছেন।
গত জুলাইয়ে ইইউ তদন্ত সংস্থাটি গ্রিসের ক্ষমতাসীন দল ‘নিউ ডেমোক্রেসি’র চারজন সংসদ সদস্যসহ ২২ জন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক চার্জশিট দাখিল করেছে। আগামী অক্টোবরে এথেন্সে এই এমপিদের বিচার শুরু হবে, যদিও তাঁরা সবাই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
সংসদে পেশ করা তদন্ত প্রতিবেদনে প্রকাশ পেয়েছে যে, ইইউর কৃষি তহবিল বিতরণের দায়িত্বে থাকা সরকারি সংস্থা ‘ওপেকেপে’-র ভেটেরিনারি কর্মকর্তা ও চিকিৎসকেরা মিলে এই পশু সনাক্তকরণ নথিপত্র জালিয়াতি করেছিলেন। দুর্নীতির দায়ে ইতিমধ্যেই ওপেকেপে সংস্থাটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
একটি মামলায় ক্ষমতাসীন দলের এক এমপির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে—তিনি এক খামারির হয়ে ওপেরেকেপের শীর্ষ কর্মকর্তাকে ফোন করে বেশি সংখ্যক গরুর ভুয়া নিবন্ধন করিয়ে ইইউ থেকে বেশি পরিমাণ ভর্তুকি পাইয়ে দেওয়ার সুপারিশ করেছিলেন। এ সংক্রান্ত মামলার শুনানি আগামী ২ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে।
এই বিশাল কেলেঙ্কারির পর নড়েচড়ে বসেছে গ্রিস সরকার। তারা ভেড়া ও ছাগল সনাক্তকরণের জন্য আধুনিক ‘ইলেকট্রনিক আইডেন্টিফিকেশন সিস্টেম’ বা পেটের ভেতর রাখার উপযোগী বিশেষ ডিজিটাল ক্যাপসুল ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে। প্রাথমিকভাবে ৯০০-র বেশি পশু রয়েছে এমন বড় খামারগুলোতে ৭ লাখ ভেড়া ও ছাগলের ওপর এই প্রযুক্তি পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবহার করা হবে, যা পরে দেশজুড়ে সম্প্রসারণ করা হবে।
গত মার্চে গ্রিস সরকার ইইউর কাছে একটি বিশেষ ‘অ্যাকশন প্ল্যান’ বা কর্মপরিকল্পনা জমা দিয়েছে, যাতে ভবিষ্যতে কৃষি তহবিলের অপব্যবহার রোধ করা যায়। ইউরোপীয় কমিশনার ক্রিস্টোফ হ্যানসেন এক বিবৃতিতে বলেন, ‘গ্রিসের কৃষি ভর্তুকি ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে ভালো অগ্রগতি হচ্ছে, তবে কাজ এখনও অনেক বাকি।’


