পর্তুগালে গ্রীষ্মকালীন পর্যটন মৌসুমের সবচেয়ে ব্যস্ততম মাসগুলো শুরু হওয়ার সাথে সাথেই হসপিটালিটি (হোটেল ও রেস্তোরাঁ) খাতের নিয়োগকর্তারা এক বড়সড় সংকটের মুখোমুখি হয়েছেন। দীর্ঘদিনের শ্রমিকের ঘাটতি মেটানোর বিপরীতে দেশটির বর্তমান কঠোর অভিবাসন নীতি এই সংকটকে আরও তীব্র করে তুলছে বলে সতর্ক করেছেন শিল্প নেতারা। তাঁদের মতে, কঠোর নিয়মের কারণে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো সেইসব বিদেশী কর্মীদের সহজে পাচ্ছে না, যাদের ওপর অনেক ব্যবসা সম্পূর্ণ নির্ভরশীল।
স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘সল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটিতে পর্যটকদের সংখ্যা রেকর্ড হারে বাড়লেও রেস্তোরাঁ, হোটেল এবং অন্যান্য মৌসুমী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় কর্মী নিয়োগে হিমশিম খাচ্ছে। এই পরিস্থিতির কারণে পর্তুগাল সরকারের কাছে আরও দ্রুত, সহজ ও অনুমানযোগ্য অভিবাসন পদ্ধতি চালুর জন্য নতুন করে দাবি উঠেছে। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, সরকার সম্প্রতি অভিবাসন বিধি কঠোর করায় এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের নতুন অভিবাসন ও আশ্রয় চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায়, বিদেশী কর্মী নিয়োগের ওপর অতিরিক্ত বিধিনিষেধ তৈরি হতে পারে।
পর্তুগালের রেস্তোরাঁ ও হোটেল অ্যাসোসিয়েশন (AHRESP)-এর মহাসচিব আনা জাসিন্তো জানিয়েছেন, নিয়োগকর্তারা ক্রমাগত উল্লেখযোগ্য কর্মী সংকটের মুখোমুখি হচ্ছেন। বিশেষ করে শেফ, রান্নাঘরের কর্মী, ওয়েটিং স্টাফ, হাউসকিপিং এবং কাস্টমার সার্ভিস বা অভ্যর্থনাকারী পদের মতো গুরুত্বপূর্ণ পরিচালনমূলক দায়িত্বগুলোতে লোক পাওয়া যাচ্ছে না। সমস্যাটি পুরনো হলেও, সম্প্রতি চাকরি ছেড়ে যাওয়া কর্মীদের জায়গায় নতুন কর্মী প্রতিস্থাপন করা বিশেষভাবে কঠিন হয়ে পড়েছে।
পর্তুগালের পরিসংখ্যান সংস্থা (INE)-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে (জানুয়ারি-মার্চ) হসপিটালিটি খাতে কর্মসংস্থান গত ১১ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। এই সময়ে খাতটিতে ৩ লাখ ৪৩ হাজার ১০০ জন কর্মী কর্মরত ছিলেন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৬,৪০০ জন (৮.৩%) বেশি। তবে জাসিন্তো যুক্তি দিয়েছেন যে, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেলেও মূল নিয়োগ সংকটের কোনো সমাধান হয়নি। গ্রীষ্মের আগমনে পর্যটকদের চাহিদা অনুযায়ী অস্থায়ীভাবে কর্মী দল শক্তিশালী করা এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ব্যাংক অব পর্তুগালের ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির পর্যটন আবাসন এবং রেস্তোরাঁ খাতে মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৩১ শতাংশই ছিল বিদেশী কর্মী; অর্থাৎ প্রতি তিনজন কর্মীর মধ্যে প্রায় একজনই অভিবাসী। জাসিন্তো সতর্ক করেছেন যে, অভিবাসন প্রবাহে যেকোনো ধরনের হ্রাস নিয়োগকর্তাদের জন্য অনিশ্চয়তা তৈরি করবে। পর্তুগালের পূর্ববর্তী ‘স্বার্থ প্রকাশ’ অভিবাসন ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার পর নতুন কর্মীদের আসার গতি কমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশত্যাগের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। তাই AHRESP এমন একটি নিয়ন্ত্রিত অথচ কার্যকর অভিবাসন ব্যবস্থা চাইছে, যেখানে প্রশাসনিক প্রক্রিয়া দ্রুত হবে এবং আইনিভাবে কর্মী নিয়োগ করা যাবে।
অনুরূপ উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অ্যাসোসিয়েশন অফ হোটেলস অফ পর্তুগাল (AHP) সংস্থার নির্বাহী সহ-সভাপতি ক্রিস্টিনা সিজা ভিয়েরা জানান, পর্যটনের ভরা মৌসুমে হোটেলগুলোতে অতিথির হার বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত কর্মীর প্রয়োজন হয়। চ্যালেঞ্জ শুধু কর্মী খোঁজার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তাদের প্রশিক্ষণ ও ধরে রাখাও একটি বড় কাজ। এই ঘাটতি শেষ পর্যন্ত পর্যটকদের সেবার মানকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করতে পারে। সংস্থাটির আগের হিসাব অনুযায়ী, শুধুমাত্র হোটেল খাতেই প্রায় ১৫,০০০ অতিরিক্ত কর্মী এবং সামগ্রিক পর্যটন খাতে আরও কয়েক দশ হাজার কর্মীর জরুরি প্রয়োজন রয়েছে।
পর্তুগিজ ব্যবসায়ী সংগঠন AEP-এর প্রেসিডেন্ট লুইস মিগুয়েল রিবেইরো পর্তুগালের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম প্রধান বাধা হিসেবে এই শ্রমের ঘাটতিকে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে ইতিবাচক অভিবাসন নীতি বজায় রাখা জরুরি। একই সাথে তিনি সতর্ক করেন, এই গ্রীষ্মে পর্তুগালের পুনরুদ্ধার ও স্থিতিস্থাপকতা পরিকল্পনা (PRR)-এর আওতায় অর্থায়িত প্রকল্পগুলো সম্পন্ন করার সময়সীমা শ্রম বাজারের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
অন্যদিকে, দেশটির কৃষিক্ষেত্রে একটি বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। পর্তুগালের কৃষি কনফেডারেশনের মহাসচিব লুইস মিরার মতে, এই খাতের জন্য অভিবাসন অপরিহার্য এবং চলতি বছরে ইতোমধ্যে ৩,০০০-এর বেশি কাজের ভিসা দেওয়া হয়েছে, যা বছর শেষে ৫,০০০ ছাড়াতে পারে। তবে কর ও সামাজিক নিরাপত্তা নম্বর পেতে প্রশাসনিক বিলম্ব এবং সাশ্রয়ী আবাসের অভাব এখানে বড় বাধা।
এর বিপরীতে, রাইড-হেইলিং (TVDE) চালকদের প্রায় অর্ধেক বিদেশী নাগরিক হলেও বর্তমানে চালকের অতিরিক্ত সরবরাহ থাকায় তারা কিছুটা কম চিন্তিত। একই সাথে ডেলিভারি প্ল্যাটফর্মগুলোও তাৎক্ষণিক কোনো সংকটের কথা জানায়নি, তবে তারা স্বীকার করেছে যে ভবিষ্যতে রেসিডেন্স পারমিট বা বসবাসের অনুমতিপত্র নবায়নের জটিলতা কর্মশক্তির একাংশকে প্রভাবিত করতে পারে।
তথ্যসূত্র:দ্য প্রেসিডেন্ট


