মরক্কো সীমান্তে সেউতা সংকটের সমাধান না হওয়ায় নিজেদের অভিবাসন ও রাজনৈতিক আশ্রয় সংক্রান্ত আইন সংস্কারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্পেন সরকার। গত জুলাইয়ে মরক্কো থেকে নজিরবিহীন গণঅনুপ্রবেশের পর স্পেনের এই ছিটমহলে এখনও প্রায় ২,০০০ শিশুসহ ৫,০০০ অভিবাসী আটকে আছেন।
স্পেন সরকার জানিয়েছে, তারা খুব শীঘ্রই অভিবাসন ও রাজনৈতিক আশ্রয় সংক্রান্ত আইন সংস্কারের জন্য একটি খসড়া বিল পেশ করতে যাচ্ছে। গত জুলাইয়ে মাত্র একদিনে মরক্কো সীমান্ত দিয়ে রেকর্ড ৮০,০০০ মানুষের অবৈধ অনুপ্রবেশের পর সৃষ্ট তীব্র রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ সামাল দিতেই এই বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।
মাদ্রিদ জানিয়েছে, এই সংস্কারের মূল উদ্দেশ্য হলো ‘স্প্যানিশ আইনকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)-এর নতুন মাইগ্রেশন অ্যান্ড অ্যাসাইলাম প্যাকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা’, যা চলতি গ্রীষ্মে কার্যকর হয়েছে।
অবৈধভাবে সীমান্ত পাড়ি দেওয়া ৮০,০০০ মানুষের সিংহভাগ ইতিমধ্যেই মরক্কোয় ফেরত গেলেও, প্রায় ৫,০০০ মানুষ এখনও স্পেনের এই ছিটমহলে আটকা পড়ে আছেন। এদের মধ্যে প্রায় ২,০০০ জনই অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্ক বা শিশু।
এই শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টি মাদ্রিদের জন্য অত্যন্ত সংবেদনশীল ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। কারণ একদিকে আইনি বাধ্যবাধকতা এবং ব্রাসেলস ও সেউতার আঞ্চলিক প্রশাসনের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী অবৈধভাবে প্রবেশ করা সবাইকে ফেরত পাঠানোর কথা, অন্যদিকে ইইউ আইন অনুযায়ী শিশুদের সুরক্ষার বিষয়টিও জড়িত।
একটি জরুরি ডিক্রির মাধ্যমে এই শিশুদের স্পেনের মূল ভূখণ্ডে স্থানান্তর করার প্রচেষ্টা স্থবির হয়ে পড়েছে। কারণ এ বিষয়ে স্পেনের কেন্দ্রীয় সরকার, রক্ষণশীল বিরোধী দল এবং সেউতার আঞ্চলিক সরকারের মধ্যে তীব্র মতভেদ দেখা দিয়েছে।
এদিকে, ইউরোপীয় কমিশন জানিয়েছে—যাদের ইইউ ভূখণ্ডে থাকার কোনো আইনি ভিত্তি নেই, স্পেনকে অবশ্যই তাদের ফেরত পাঠাতে হবে। তবে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুযায়ী শিশুদের অধিকারও সুনিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু মাদ্রিদ এখনও এই জটিলতার কোনো কার্যকর সমাধান খুঁজে পায়নি।
গত মঙ্গলবার অনুমোদিত এই খসড়া বিলটি কেবল সেউতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি গত ১২ জুন থেকে কার্যকর হওয়া সামগ্রিক ইউরোপীয় অভিবাসন চুক্তিটি স্পেনে বাস্তবায়ন করবে এবং ইইউ-এর বিশেষ ‘স্ক্রিনিং’ বা যাচাইকরণ প্রক্রিয়া চালু করবে। নতুন এই আইনটি স্পেনের ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জেও (Canary Islands) কার্যকর হবে, যেখানে সাম্প্রতিক সময়ে নৌকাযোগে অবৈধ অভিবাসীদের আগমন আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে।
চলমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্পেন সরকার সেউতা সংকটকে সরাসরি ‘জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়’ হিসেবে ঘোষণা করেছে এবং পরিস্থিতি মোকাবেলায় একটি ‘একক কমান্ড’ গঠনের আহ্বান জানিয়েছে।
সংকট শুরু হওয়ার প্রায় এক মাস পর নেওয়া এই সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে বিরোধী দল ‘পিপলস পার্টি’। সেউতার আঞ্চলিক প্রেসিডেন্ট হুয়ান ভিভাস গত কয়েক সপ্তাহ ধরে কেন্দ্রীয় সরকারকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার জন্য বারবার আকুতি জানিয়ে আসছিলেন, কারণ স্বায়ত্তশাসিত এই শহরটির আশ্রয় দেওয়ার সমস্ত ক্ষমতা ভেঙে পড়েছিল।
একদিনেই কীভাবে এত বিপুল পরিমাণ মানুষ মরক্কো সীমান্ত পাড়ি দিয়ে সেউতায় প্রবেশ করল, সে বিষয়ে স্পেন সরকার এখনও কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেয়নি। তবে তারা মানবপাচারকারী চক্র এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের একটি গুজবকে দায়ী করেছে; যার মাধ্যমে তরুণ মরক্কোন এবং উপ-সাহারা অঞ্চলের অভিবাসীদের বিশ্বাস করানো হয়েছিল যে তারা সেউতায় ঢুকলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়ে যাবেন।
যদিও সরকারের বেশ কয়েকজন মন্ত্রী ইতিমধ্যেই সেউতা সফর করেছেন, তবে স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ গত ৩১ জুলাই সেউতা পরিদর্শনের পর থেকে এই সংকট নিয়ে জনসমক্ষে আর কোনো মন্তব্য করেননি। ওই সফরে তিনি বলেছিলেন—স্পেনের ভৌগোলিক অখণ্ডতা ‘লঙ্ঘিত হয়েছে’, তবে এই অনুপ্রবেশের জন্য তিনি মরক্কোকে সরাসরি দোষারোপ করেননি।
অন্যদিকে, মরক্কোর রাজধানী রাবাত দাবি করেছে—চলতি বছরের শুরুর দিকে মাদ্রিদ কর্তৃক বিপুল সংখ্যক অভিবাসীকে ঢালাওভাবে বৈধতা দেওয়ার সিদ্ধান্তের কারণেই মূলত এই ভুল বার্তা বা সংকেত তৈরি হয়েছিল।


