ইউরোপের দেশগুলোতে শিক্ষকদের বেতনে বিশাল ব্যবধান রয়েছে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় সমন্বয়ের পরও এই ব্যবধান স্পষ্ট থেকে যায়। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার (ওইসিডি) ‘এডুকেশন অ্যাট আ গ্ল্যান্স ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, শিক্ষকতা পেশায় মেধাবীদের আকৃষ্ট ও ধরে রাখতে যে বেতন দেওয়া হচ্ছে, তা অন্যান্য সমমানের পেশার তুলনায় যথেষ্ট আকর্ষণীয় নয়।
প্রতিবেদনে ইউরোপের ২৮টি শিক্ষাব্যবস্থা তুলনা করে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে প্রাইমারি বা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পূর্ণকালীন শিক্ষকদের বার্ষিক প্রকৃত বেতন তুরস্কের ১৮ হাজার ৬৬৯ ইউরো থেকে শুরু করে ডেনমার্কের ৭৪ হাজার ৮৬ ইউরো পর্যন্ত উঠেছে।
ইউরোপের শীর্ষ পাঁচ সর্বোচ্চ বেতন প্রদানকারী দেশের মধ্যে রয়েছে ডেনমার্ক (€৭৪,০৮৬), আইসল্যান্ড (€৭৩,৭৫২), আয়ারল্যান্ড (€৬৯,৭৪৭), জার্মানি (€৬৯,৪৫৩) এবং অস্ট্রিয়া (€৬৫,৮৫১)। এই দেশগুলোতে শিক্ষকদের বেতন বছরে ৬৫ হাজার ইউরোর ওপরে।
নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, বেলজিয়াম এবং যুক্তরাজ্যের চারটি অঞ্চলেও (ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও উত্তর আয়ারল্যান্ড) শিক্ষকদের বেতন ৫০ হাজার ইউরোর বেশি।
প্রধান অর্থনীতিগুলোর চিত্র
ইউরোপের প্রধান শক্তিশালী অর্থনীতিগুলোর মধ্যে জার্মানি শিক্ষকদের সবচেয়ে বেশি বেতন দেয়। ফ্রান্সে শিক্ষকেরা বছরে গড়ে ৪১ হাজার ৯৬৮ ইউরো পেলেও প্রধান দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কম বেতন ইতালিতে—মাত্র ৩২ হাজার ১০০ ইউরো।
অন্যদিকে চেক প্রজাতন্ত্র, হাঙ্গেরি, স্লোভাকিয়া, রোমানিয়া, লাটভিয়া, গ্রিস এবং তুরস্কে শিক্ষকদের বার্ষিক বেতন ২৫ হাজার ইউরোরও নিচে।
ইউরোপীয় ফেডারেশন অব এডুকেশন এমপ্লয়ার্সের মহাসচিব ড্যানিয়েল উইসনিভস্কি জানান, কোনো একক কারণে নয়; বরং জাতীয় আয়ের স্তর, বেতনের কাঠামো, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং পেশাগত অগ্রগতির পার্থক্যের কারণেই এই বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
সাধারণত প্রাইমারির চেয়ে উচ্চ মাধ্যমিক বা হায়ার সেকেন্ডারির শিক্ষকেরা বেশি বেতন পেয়ে থাকেন। উচ্চ মাধ্যমিকে সর্বোচ্চ বেতন দেওয়া হয় আইসল্যান্ডে (বছরে প্রায় ৯৩,৯৩৮ ইউরো), ডেনমার্কে (৮৫,৯৯৯ ইউরো) এবং জার্মানিতে (৮০,১৬৩ ইউরো)।
ক্রয়ক্ষমতার হিসাবে কে কোথায়?
শুধু টাকার অঙ্কে আসল চিত্র বোঝা যায় না, কারণ কোনো দেশে পণ্যের দাম বেশি হলে বেশি বেতন পেয়েও কম পণ্য কেনা যায়। ইউরোস্ট্যাটের ‘পারচেজিং পাওয়ার স্ট্যান্ডার্ড’ বা ক্রয়ক্ষমতার সমতা (পিপিপি) হিসাব করে দেখা গেছে, জার্মান শিক্ষকরা ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
মূল্যস্ফীতি ও দ্রব্যমূল্যের পার্থক্যের পর প্রাথমিক শিক্ষকদের বার্ষিক ক্রয়ক্ষমতা গ্রিসে যেখানে সর্বনিম্ন ২১ হাজার ৪৫৬ পিপিএস (PPS), সেখানে জার্মানিতে তা সর্বোচ্চ ৬৪ হাজার ১৪৩ পিপিএস। জার্মানির পর সেরা ক্রয়ক্ষমতার তালিকায় রয়েছে অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, আয়ারল্যান্ড ও বেলজিয়াম।
আর সবচেয়ে কম কেনাকাটা করতে পারেন গ্রিস, লাটভিয়া, স্লোভাকিয়া, চেক প্রজাতন্ত্র ও এস্তোনিয়ার শিক্ষকরা।
ক্রয়ক্ষমতার হিসাবে তুরস্ক ও পোল্যান্ডের শিক্ষকদের অবস্থান কাগজ-কলমের চেয়ে বেশ কিছুটা উন্নত হয়। অন্যদিকে আইসল্যান্ডের শিক্ষকরা কাগুজে বেতনে দ্বিতীয় হলেও উচ্চ দ্রব্যমূল্যের কারণে ক্রয়ক্ষমতার তালিকায় নেমে গেছে ১২ নম্বরে।
শিক্ষক সংকটের ঝুঁকি
ড্যানিয়েল উইসনিভস্কি উল্লেখ করেন, ওইসিডিভুক্ত দেশগুলোতে শিক্ষকদের গড় বেতন সমমানের উচ্চশিক্ষিত অন্যান্য চাকরিজীবীদের তুলনায় মাত্র ৮৭ থেকে ৯৫ শতাংশ। অর্থাৎ একই যোগ্যতার ব্যক্তিরা অন্য পেশায় অনেক বেশি আয় করতে পারেন।
ইউরোপীয় ট্রেড ইউনিয়ন কমিটি ফর এডুকেশনের পরিচালক জেলমার এভার্স বলেন, শিক্ষকতার মতো জটিল ও সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পেশায় সংকট কাটাতে শিক্ষকদের বেতন অন্তত অন্যান্য সমমানের পেশাদারদের সমান হওয়া উচিত। শিক্ষকদের যথাযথ মূল্যায়ন না করলে ভবিষ্যতে ইউরোপজুড়ে শিক্ষক সংকট আরও তীব্র হবে।


