জার্মানিতে তরুণদের নেতৃত্বে চলা বিক্ষোভে সহিংসতার জন্য বামপন্থী ও অভিবাসীদের দায়ী করেছেন দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডোব্রিন্ট। শনিবার (৩১ অক্টোবর) দেশটির বিভিন্ন শহরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাব্যবস্থা, সামরিক সেবা ও সরকারের নীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলাকালে ভাঙচুর, লুটপাট ও পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
বিক্ষোভের শুরুতে পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও সন্ধ্যার দিকে ফ্রাঙ্কফুর্টে বিক্ষোভকারীদের একাংশ দোকানের জানালা ভাঙচুর ও লুটপাট শুরু করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে। বার্লিন, কোলন ও হামবুর্গেও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। এসব শহরে বিক্ষোভকারীদের একাংশ পুলিশের দিকে পেট্রলবোমা, বোতল ও আতশবাজি ছুড়ে মারে। আটটিরও বেশি শহরে ব্যাপক ধরপাকড় চালায় পুলিশ।
জার্মানির ক্ষমতাসীন রক্ষণশীল দল ক্রিশ্চিয়ান সোশ্যাল ইউনিয়নের (সিএসইউ) সদস্য ডোব্রিন্ট বলেন, অভিবাসী সম্প্রদায়ের কিছু ‘উচ্ছৃঙ্খল ব্যক্তি’ বামপন্থী উগ্রবাদী ও অন্যান্য কট্টর বামপন্থী গোষ্ঠীর সঙ্গে মিলে সহিংসতায় জড়িয়েছেন।
আয়োজকদের দাবি, দেশজুড়ে বিক্ষোভে অংশ নিয়েছেন প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ। তবে ‘জেন-জি রুলস’ নামের আন্দোলনটির আয়োজকেরা জোর দিয়ে বলেছেন, তাঁদের দাবি আদায়ের পথ হতে হবে শান্তিপূর্ণ। বিক্ষোভে সহিংসতার কোনো স্থান নেই বলেও তাঁরা অংশগ্রহণকারীদের সতর্ক করেন।
তবে বিক্ষোভকারীদের কেউ কেউ মনে করেন, কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে আরও কঠোর কর্মসূচি প্রয়োজন।
বার্লিনে বিক্ষোভকারী ১৯ বছর বয়সী এমিল ভাইসকোল দ্য টেলিগ্রাফকে বলেন, ‘ফ্রান্সের তুলনায় আমাদের বিক্ষোভ হাস্যকর। আমাদের আরও উগ্র হতে হবে। কেউ আমাদের সমস্যার কথা বলে না। সবকিছুর দাম অনেক বেশি, আর স্কুলগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারের জন্যও প্রস্তুত নয়।’
তরুণদের অসন্তোষের পেছনে রয়েছে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের সরকারের প্রতি ক্ষোভ, জীবনযাত্রার বাড়তি ব্যয় এবং সামরিক সেবায় যুক্ত হওয়ার বাধ্যবাধকতা নিয়ে উদ্বেগ।
বার্লিনের ২৭ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী ফিলিপ গ্রোশেল বলেন, ‘যুদ্ধ শুধু ধনীদের স্বার্থ রক্ষা করে। তাই অর্থ ব্যয় করা উচিত শিক্ষা ও সহায়তার পেছনে। আমার মনে হয় না, যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেই যুদ্ধ ঠেকানো যাবে।’
সামরিক সেবা নিয়ে বিতর্ক
জার্মানিতে সামরিক নিয়োগব্যবস্থা নিয়ে চলমান বিতর্কের মধ্যে এই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হলো। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে দেশটিতে বাছাইভিত্তিক সামরিক নিয়োগের প্রক্রিয়া চালু হয়েছে। এর আওতায় সামরিক বয়সসীমার মধ্যে থাকা ১৭ থেকে ৪৫ বছর বয়সী পুরুষদের শারীরিক সক্ষমতা পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়। একই সঙ্গে বাধ্যতামূলক সামরিক নিয়োগ আবার চালু করা হবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ১৮ থেকে ৪৫ বছর বয়সী পুরুষদের তিন মাসের বেশি সময়ের জন্য জার্মানি ছাড়তে অনুমতি নেওয়ার নিয়ম চালু হয়েছিল। পরে নিয়মটি আবার স্থগিত করা হয়।
বিক্ষোভে মূল ভূমিকা রেখেছেন জেন-জি প্রজন্মের সদস্যরা—যাঁদের জন্ম ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে। তবে তাঁদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বিভিন্ন বয়সের মানুষও বিক্ষোভে যোগ দেন। তাঁদের অনেকের বক্তব্যেই যুদ্ধবিরোধী মনোভাব উঠে আসে।
৭৪ বছর বয়সী হেইঞ্জ একেল বলেন, ‘যুদ্ধের চেয়ে আমাদের আরও জরুরি সমস্যা রয়েছে। দেশের অবকাঠামো যখন ভেঙে পড়ছে, তখন লড়াইয়ের কথা বলার সময় এটি নয়।’রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ যখন সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে, তখন জার্মানিতে এ নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হচ্ছে।
মের্ৎসের জনপ্রিয়তায় ধস
এদিকে জার্মানির চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মের্ৎসের জনসমর্থনও রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, তরুণদের সমস্যা সমাধানে সরকার যথেষ্ট মনোযোগ দিচ্ছে না।
২৩ বছর বয়সী মালেনা ভালগে বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষাক্ষেত্রে তরুণদের সমস্যার দিকে তিনি চোখ বন্ধ করে রাখেন। তিনি শুধু নিজের স্বার্থ নিয়েই ভাবেন।’
বিক্ষোভে বিভিন্ন স্লোগান ও প্ল্যাকার্ডে মের্ৎসের পদত্যাগ দাবি করা হয়। তাঁর নেতৃত্বাধীন ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (সিডিইউ) সাম্প্রতিক কয়েকটি স্থানীয় নির্বাচনে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়েছে। জনমত জরিপে কট্টর ডানপন্থী অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (এএফডি) দলটির তুলনায় সিডিইউ পিছিয়ে পড়েছে।নভেম্বরজুড়েও বিক্ষোভ অব্যাহত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জার্মানির বিভিন্ন স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সপ্তাহের অবরোধ কর্মসূচির পরিকল্পনা করছে ‘জেন-জি রুলস’।
ইউরোপজুড়ে তরুণদের বিক্ষোভ
জার্মানির এই আন্দোলন ইউরোপের অন্যান্য দেশে তরুণদের নেতৃত্বে চলা বিক্ষোভের ধারাবাহিকতা। গত মাসে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি, স্পেন ও আলবেনিয়ায়ও তরুণদের বিক্ষোভ শুরু হয়।
ফ্রান্সে শিক্ষার্থীরা মধ্যবর্তী ছুটি শেষে সোমবার থেকে আবারও স্কুল অবরোধের ডাক দিচ্ছেন। শনিবার প্যারিসে কালো পোশাক ও মুখোশ পরা কয়েক ডজন ব্যক্তি হাতুড়ি দিয়ে রাস্তার পাথর তুলে পুলিশের দিকে ছুড়ে মারেন।
রোববার একটি পেট্রলবোমা হামলার ঘটনায় হত্যাচেষ্টার তদন্ত শুরু হয়েছে। ওই হামলায় এক পুলিশ কর্মকর্তা আহত হন। ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ ঘটনাটিকে হত্যাচেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করেছেন।


