স্পেনের সাথে আকাশ ও নৌ-সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ পুনরায় চালু করেছে ইতালি। অন্যদিকে ফিনল্যান্ড এবং ডেনমার্ক স্পেনের জন্য ইউরোপের অবাধ যাতায়াতের (শেনজেন) নিয়মগুলো সম্পূর্ণরূপে স্থগিত করার দাবি জানিয়েছে। তবে এই প্রক্রিয়াটি শুরু করার দায়িত্ব ইউরোপীয় কমিশনের, যা এই মুহূর্তে ঘটার কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না।
মরক্কো সীমান্ত পেরিয়ে প্রায় ৬০ হাজার অবৈধ অভিবাসী স্প্যানিশ ছিটমহল সেউতায় প্রবেশ করার পর, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বেশ কয়েকটি দেশ স্পেনকে শেনজেন মুক্ত অঞ্চল থেকে সাময়িকভাবে বাদ দেওয়ার দাবি জানাচ্ছে। এটি মূলত একটি চূড়ান্ত পদক্ষেপ, যা কেবল চরম কোনো পরিস্থিতিতেই ব্যবহার করা সম্ভব।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভূখণ্ডে একদিনে রেকর্ড করা ইতিহাসে সবচেয়ে বড় এই অবৈধ অনুপ্রবেশের ঘটনাটি ইউরোপের বিভিন্ন দেশের সরকারের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। যদিও সেউতা আফ্রিকান মহাদেশে অবস্থিত হওয়ায় সেখান থেকে অভিবাসীদের জন্য মূল ইউরোপ ভূখণ্ডে পৌঁছানোর কোনো সহজ রুট নেই।
গত বৃহস্পতিবার ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি প্রথম এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন এবং ইতালির সীমান্ত রক্ষায় ‘অসাধারণ পদক্ষেপ’ নেওয়ার ঘোষণা দেন।
পরবর্তীতে গত শুক্রবার ইতালির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্তেও পিয়ান্তেডোসির সভাপতিত্বে এক বৈঠকের পর স্পেনের সাথে আকাশ ও নৌ-সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ পুনরায় চালু করে ইতালি।
ফিনল্যান্ডের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মারি রান্তানেন ইতালির এই দাবিকে সমর্থন করেছেন এবং অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোকেও একই পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট ফ্রেডেরিকসেনও এই বিকল্পটি বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছেন। এ ছাড়া ইউরোপের শীর্ষস্থানীয় ডানপন্থী নেতারাও একই সুরে কথা বলছেন।
কিন্তু স্পেনকে কি আসলেই শেনজেন এলাকা থেকে স্থগিত বা বাদ দেওয়া সম্ভব?
শেনজেন বর্ডারস কোড বা নিয়ম অনুযায়ী, ইইউ কোনো দেশের শেনজেনে অংশগ্রহণ স্থগিত করার সুপারিশ করতে পারে শুধুমাত্র একটি চূড়ান্ত পদক্ষেপ (লাস্ট-রিসোর্ট) হিসেবে, যা কেবল ‘বহিরাগত সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে ক্রমাগত গুরুতর ব্যর্থতা দেখা দিলে’ ব্যবহার করা যেতে পারে।
এমন পরিস্থিতিতে, ইউরোপীয় কমিশনকে প্রথমে এই স্থগিতাদেশের প্রস্তাব করতে হবে, যা পরবর্তীতে ইইউর অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মাধ্যমে অনুমোদিত হতে হবে।
এরপর সংশ্লিষ্ট দেশটিকে অন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সাথে তার অভ্যন্তরীণ সীমান্তে পুনরায় নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করার সুপারিশ করা হবে। তবে এই প্রক্রিয়াটি অদূর ভবিষ্যতে কার্যকর হওয়ার কোনো লক্ষণ নেই।
ইইউর একজন কর্মকর্তা এ নিয়ে বিস্তারিত কিছু না বললেও মন্তব্য করেছেন, ‘নিয়মিত মূল্যায়ন করা হয় এবং সীমান্ত ক্রসিং পয়েন্টে কোনো গুরুতর ঘাটতি ধরা পড়লে, আমরা একটি প্রতিবেদন জারি করি যা প্রথমে সংশ্লিষ্ট সদস্য রাষ্ট্রের সাথে আলোচনা করা হয়।’
ইউরোপীয় কমিশন আরও ইঙ্গিত দিয়েছে যে, শেনজেন ব্যবস্থার অধীনে স্প্যানিশ ছিটমহল সেউতা এবং মেলিলার জন্য বিশেষ নিয়ম প্রযোজ্য, যা অবাধ যাতায়াতের ক্ষেত্রে এগুলোকে কার্যত বহিরাগত ভূখণ্ডে পরিণত করেছে।
ইইউর একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘সেউতা ও মেলিলা এবং শেনজেন এলাকার বাকি অংশের মধ্যে ইতিমধ্যেই সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা রয়েছে।’
ইইউর যেকোনো দেশ সাময়িকভাবে স্পেনের সাথে তার অভ্যন্তরীণ সীমান্তে তল্লাশি পুনরায় চালু করতে পারে, যার মেয়াদ সর্বোচ্চ ছয় মাস পর্যন্ত বাড়ানো সম্ভব, যেমনটি ইতালি আপাতত এক মাসের জন্য করেছে।
এদিকে, ফ্রান্স ইতিমধ্যেই তাদের সমস্ত স্থল সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু রেখেছে। তবে এই সিদ্ধান্তটি সেউতা সংকটের আগের এবং এটি ভিন্ন কিছু কারণের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়েছিল; যার মধ্যে রয়েছে ক্রমাগত জিহাদিদের হুমকি, ইহুদি-বিরোধী হামলা বৃদ্ধি এবং অভিবাসীদের মধ্যে সহিংসতা বৃদ্ধি।
সেউতা সংকট শুরু হওয়ার পর ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরেন্ট নুনেজ সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
স্পেনের সাথে স্থল সীমান্ত থাকা ইইউর আরেকটি দেশ পর্তুগাল এখনও এই ধরনের কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। তবে এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে তারা জানিয়েছে যে, ‘শেনজেন ব্যবস্থার অখণ্ডতা কঠোর বহিরাগত সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভর করে।’


