মাত্র ১০ দিনে ১,০৭৫ বারের বেশি মৃদু ও মাঝারি ভূমিকম্পে কেঁপে উঠেছে স্পেনের গ্রানাডা শহর। এর মধ্যে দুটি কম্পনের তীব্রতা ছিল রিখটার স্কেলে ৪.৮। গত ১৪ আগস্ট শুরু হওয়া এই ধারাবাহিক ভূকম্পন কেবল আন্দালুসিয়া নয়, বরং পুরো স্পেনের সাধারণ মানুষ ও বিজ্ঞানীদের মনে এক বড় প্রশ্ন উসকে দিয়েছে—স্পেন কি তবে খুব শীঘ্রই কোনো বড় ও বিধ্বংসী ভূমিকম্পের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে?
স্পেনের ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ইনস্টিটিউট জানিয়েছে, ২৪ আগস্ট পর্যন্ত ১,০৭৫টি কম্পন অনুভূত হয়েছে। এর মধ্যে ৪.৮ মাত্রার দুটি প্রধান কম্পন ছিল অত্যন্ত অগভীর (ভূগর্ভের একদম কাছাকাছি), যার ঝাঁকুনি আন্দালুসিয়া থেকে শুরু করে মার্সিয়া, কাস্তিলা-লা মাঞ্চা এবং এমনকি রাজধানী মাদ্রিদসহ ৫০০-রও বেশি এলাকায় অনুভূত হয়েছে।
স্পেনের ইতিহাসে বড় ও বিধ্বংসী ভূমিকম্পের বেশ কয়েকটি রেকর্ড রয়েছে। ১৮৮৪ সালে গ্রানাডার আরেনাস দেল রে এলাকায় ৬.৫ মাত্রার এক শক্তিশালী ভূমিকম্পে অন্তত ১০০টি গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল এবং ৭৫০ থেকে ৯০০ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালে ডুরকাল এলাকায় ৭.৮ মাত্রার একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ভূমিকম্প রেকর্ড করা হয়েছিল, তবে সেটির উৎপত্তিস্থল ভূগর্ভের প্রায় ৬৫০ কিলোমিটার গভীরে হওয়ায় ভূপৃষ্ঠে তেমন বড় ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
আরেকটি বড় দুর্যোগের পূর্বাভাস?
ইউরোপীয় সংবাদমাধ্যম ইউরোনিউজ-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্পেনের ভূতাত্ত্বিক ও খনি ইনস্টিটিউট-এর জরুরি ভূতত্ত্ববিদ রাউল পেরেজ লোপেজ বলেন, ‘স্পেনের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ৪ মাত্রার ওপর ভূমিকম্প হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। এই অঞ্চলে এমন অনেক ফল্ট বা ফাটল রয়েছে যা ৫ থেকে ৬ মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি করতে সক্ষম।’
১৮৮৪ সালের সেই বিধ্বংসী ভূমিকম্পের পর ইতিমধ্যে প্রায় ১৪০ বছর কেটে গেছে। অনেকে একে ‘টিকিং ক্লক’ বা বিপদ ঘনিয়ে আসার সময় হিসেবে দেখছেন। তবে পেরেজ লোপেজ পরিসংখ্যানের এই তত্ত্বটি নাকচ করে দিয়ে বলেন, পরিসংখ্যানগত গড় হিসাব দিয়ে পরবর্তী ভূমিকম্পের সময় নির্ধারণ করা যায় না।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, ‘আমরা যদি অতীতের মোট বড় ভূমিকম্পের সংখ্যাকে বছরের ব্যবধান দিয়ে ভাগ করি, তবে পরিসংখ্যান বলবে যে স্পেনে প্রতি ১০০ বছরে একটি বড় ভূমিকম্প হয়। কিন্তু ভূগর্ভস্থ টেকটোনিক প্লেটের কার্যক্রম এভাবে গাণিতিক নিয়মে চলে না। ২০০ বছর কোনো বড় কম্পন ছাড়া কেটে যাওয়ার পর হঠাৎ হুট করে পরপর দুটি বড় ভূমিকম্প আঘাত হানতে পারে।’
পেরেজ লোপেজ বলেন, ‘১৪০ বছর পার হয়ে গেছে বলেই যে খুব দ্রুত আরেকটি বড় ভূমিকম্প হবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না।’
তবে এটি সত্য যে, আফ্রিকান এবং ইউরেশিয়ান টেকটোনিক প্লেটের অনবরত ধাক্কার কারণে ভূগর্ভে প্রতিনিয়ত শক্তি জমা হচ্ছে। যত সময় যাচ্ছে, বড় ভূমিকম্পের আশঙ্কা তত বাড়ছে। কিন্তু তার মানে এই নয় যে এটি এখনই ঘটবে। পেরেজ লোপেজের ভাষায়, ‘এমন অনেক ফল্ট বা ফাটল আছে যা যেকোনো সময় ভূমিকম্প ঘটাতে পারে, কিন্তু তা আজ হবে, আগামীকাল হবে নাকি ৫০ বছর পর—তা জানার কোনো উপায় বিজ্ঞানের কাছে নেই।’
তিনি বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে একই সময়ে ভূমিকম্প হওয়ার ঘটনাকে একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কিত ভাবার ধারণাকেও ‘ভুল ধারণা’ বলে আখ্যা দেন। বৈজ্ঞানিকভাবে এগুলোর মধ্যে কোনো সংযোগ থাকে না।
ঝুঁকিতে রয়েছে স্পেনের ২০০-রও বেশি ফল্ট
ভূতত্ত্ববিদ পেরেজ লোপেজ জানান, স্পেনে অন্তত ২০০টি সক্রিয় ফল্ট বা ফাটল চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে ভূগর্ভে জমে থাকা এই শক্তি ঠিক কোন ফাটলের মাধ্যমে এবং কখন বের হবে, তা সম্পূর্ণ অজানা।
স্পেনের ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলীয় এলাকা ‘ভ্যালেন্সিয়া থেকে কাদিজ’ পর্যন্ত অঞ্চলটি সবচেয়ে বেশি ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে। এছাড়া পিরেনিজ পর্বতমালা, কাতালান পর্বতমালা এবং গ্রানাডা ও আলবাসেতের ফাটলগুলোতেও বড় কম্পন হতে পারে। ১৮২৯ সালে টোরেভিয়েজা এলাকায় ৬.৬ মাত্রার শক্তিশালী কম্পন আঘাত হেনেছিল এবং ২০১১ সালে লোরকা এলাকায় মাত্র ৫.১ মাত্রার ভূমিকম্পেই ৯ জন নিহত হয়েছিলেন।
পেরেজ লোপেজ জোর দিয়ে বলেন, ‘যেহেতু আমরা ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দিতে পারি না, তাই আমাদের হাতে থাকা একমাত্র এবং সেরা হাতিয়ার হলো—পূর্বপ্রস্তুতি বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা।’
ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির তীব্রতা কেবল রিখটার স্কেলের মাত্রার ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে ভূমিকম্পের গভীরতা এবং সবচেয়ে বড় বিষয়—সেখানকার ঘরবাড়ির নির্মাণশৈলীর ওপর। ভূতত্ত্ববিদ পেরেজ লোপেজ বলেন, ‘ভূমিকম্পে মানুষ কিন্তু কম্পনের কারণে মারা যায় না, মানুষ মারা যায় দুর্বল ভবন ধসে পড়ার কারণে।’
এ কারণেই ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকাগুলোর মানচিত্র (হ্যাজার্ড ম্যাপ) তৈরি করে সেই অনুযায়ী ভূমিকম্প-সহনীয় ভবন বা কোড মেনে বাড়িঘর নির্মাণ করা উচিত। তিনি ভেনেজুয়েলা ও কলম্বিয়ার উদাহরণ দিয়ে বলেন, একই মাত্রার কম্পন হলেও ভবনগুলোর শক্তি বা মজবুত কাঠামোর কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণে আকাশ-পাতাল তফাত দেখা যায়।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভূতপূর্ব উন্নয়ন সত্ত্বেও কেন ভূমিকম্পের পূর্বাভাস দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না—তার ব্যাখ্যায় তিনি বলেন, প্রকৃতি বা ভূগর্ভের ভেতরে ফাটলটি ঠিক কখন এবং কীভাবে ভাঙতে শুরু করবে, তার জটিলতা এখনও মানুষের বোধগম্যতার বাইরে। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ‘ডিপ লার্নিং’ প্রযুক্তির সাহায্যে ফল্টগুলোর ওপর আরও নিবিড় নজরদারি চালানো সম্ভব হলে হয়তো ভূমিকম্পের আগাম সংকেত পাওয়ার পথ উন্মুক্ত হবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে পেরেজ লোপেজ বলেন, ‘আপাতত আমরা সম্পূর্ণ অন্ধকারের মধ্যেই রয়েছি।’


