মলদোভার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগদানের বিষয়টি এখন আর শুধু ইউরোপীয় আইন ও নীতিমালা গ্রহণের প্রক্রিয়া নয়। রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান চাপের মধ্যে দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক কাঠামোকে নতুন করে গড়ে তোলার সঙ্গে ইইউতে যোগদানের বিষয়টি সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে।
ইইউভুক্ত হওয়ার পথে মলদোভার সামনে এখন দুটি বড় কাজ। একদিকে দেশটিকে নিজেদের প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করতে হবে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং আইনের শাসনের ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। অন্যদিকে, ইইউর মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের হাজার হাজার আইন ও নীতিমালা পরিবর্তন করতে হবে।
মলদোভার ইউরোপীয় ইন্টিগ্রেশনবিষয়ক মন্ত্রী ক্রিস্টিনা ঘেরাসিমভ স্বীকার করেছেন, অন্য কয়েকটি প্রার্থী দেশের তুলনায় মলদোভা এখনও অনেক পিছিয়ে। তবে দেশটির জন্য এই প্রক্রিয়া এখন শুধু সদস্যপদ অর্জনের বিষয় নয়; বরং একটি কার্যকর ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র গড়ে তোলারও সুযোগ।
আইনের শাসন ও দুর্নীতি মোকাবিলা
মলদোভার সংস্কার কর্মসূচির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হলো বিচারব্যবস্থা সংস্কার। দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত বিচারক ও প্রসিকিউটরদের যাচাই-বাছাই করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে নতুনভাবে সাজানোর চেষ্টা চলছে।
তবে এই সংস্কারের পথে বাধাও রয়েছে। দীর্ঘদিনের ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কিছু গোষ্ঠী পরিবর্তন ঠেকাতে চাইছে বলে মলদোভা সরকার মনে করছে। ফলে ইইউতে যোগদানের প্রস্তুতি শুধু আইন পরিবর্তনের বিষয় নয়—দেশটির রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও বড় পরিবর্তন আনতে হচ্ছে।
রাশিয়ার প্রভাব বড় চ্যালেঞ্জ
মলদোভার ইউরোপমুখী নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রেক্ষাপট হলো রাশিয়ার সঙ্গে দেশটির সম্পর্ক। সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ থাকার দীর্ঘ ইতিহাস এবং বর্তমান ভূরাজনৈতিক অবস্থানের কারণে মলদোভা এখনও রুশ প্রভাবের চাপ অনুভব করে।
ইউক্রেন যুদ্ধের পর এই চাপ আরও স্পষ্ট হয়েছে। মলদোভার সরকার মনে করছে, ইউরোপীয় কাঠামোর সঙ্গে দ্রুত ও গভীরভাবে যুক্ত হওয়া দেশটির রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এই কারণেই মলদোভার কাছে ইইউ সদস্যপদ এখন শুধু অর্থনৈতিক সুবিধার প্রশ্ন নয়। এটি দেশটি ভবিষ্যতে কোন রাজনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক পথে এগোবে—সেই সিদ্ধান্তেরও অংশ।
কেন ‘Survival’ বা টিকে থাকার প্রশ্ন?
মলদোভার ক্ষেত্রে ‘survival’ শব্দটি আক্ষরিক অর্থে দেশটির অস্তিত্ব বিলীন হওয়ার কথা বোঝায় না। বরং এটি রাজনৈতিক স্বাধীনতা, শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং রুশ প্রভাব থেকে নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখার বৃহত্তর প্রশ্নকে বোঝায়।
ইইউর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক মলদোভাকে ইউরোপীয় অর্থনীতি ও রাজনৈতিক কাঠামোর সঙ্গে আরও শক্তভাবে যুক্ত করতে পারে। একই সঙ্গে দেশটির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতাগুলো কাটিয়ে ওঠার জন্যও ইইউ সদস্যপদের প্রস্তুতি একটি বড় প্রেরণা হিসেবে কাজ করছে।
সামনে কঠিন পথ
তবে ইইউতে যোগ দেওয়া সহজ হবে না। দুর্নীতি দমন, বিচারব্যবস্থা সংস্কার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ইউরোপীয় মানদণ্ড অনুযায়ী আইন পরিবর্তনের মতো কঠিন কাজ মলদোভাকে সম্পন্ন করতে হবে।
তারপরও চিসিনাউয়ের কাছে ইউরোপের পথ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দেশটির জন্য ইইউ সদস্যপদ তাই কেবল একটি কূটনৈতিক লক্ষ্য নয়; বরং একটি স্বাধীন, স্থিতিশীল ও ইউরোপমুখী রাষ্ট্র হিসেবে ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার কৌশল।
মলদোভার ইউরোপীয় বাজি আসলে শুধু ‘ইইউতে যোগ দেওয়া’র বাজি নয়। এটি দেশটির প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি, রাজনৈতিক পরিচয় এবং রাশিয়ার প্রভাবের বাইরে নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের লড়াই।


