স্পেন, জার্মানি ও হংকংয়ে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটার নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সেবা চালু করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।এ লক্ষ্যে চলতি নভেম্বরে হংকং ও জার্মানিতে ইসির জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের কারিগরি দল পাঠানো হবে। এরপর ডিসেম্বরে স্পেনে যাবে আরেকটি দল।
বুধবার নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ এ তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ইসির প্রশাসনিক ও কারিগরি দল সংশ্লিষ্ট দূতাবাস ও কনস্যুলার অফিসের কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন ও ডেটা সংযোগের ব্যবস্থা করে ধাপে ধাপে নিবন্ধন কার্যক্রমের পরীক্ষামূলক কাজ চালানো হবে।
১৭ দেশে ২৭ স্টেশনে এনআইডি সেবা
ইসি কর্মকর্তারা জানান, ২০২৩ সাল থেকে ২০২৬ সালের ২ নভেম্বর পর্যন্ত ১৭টি দেশের ২৭টি মিশনে প্রবাসীদের কাছ থেকে ১ লাখ ৮ হাজার ২০৬টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৩০ হাজারের বেশি এনআইডি কার্ড ছাপানো হয়েছে। আরও ৩ হাজার ৭১৬টি কার্ড ছাপানোর জন্য প্রস্তুত রয়েছে।
যেসব দেশ ও শহরে এ সেবা চালু রয়েছে, সেগুলো হলো—সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবি ও দুবাই, সৌদি আরবের রিয়াদ ও জেদ্দা, যুক্তরাজ্যের লন্ডন, ম্যানচেস্টার ও বার্মিংহাম, ইতালির রোম ও মিলান, কুয়েত সিটি, কাতারের দোহা, মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর, অস্ট্রেলিয়ার ক্যানবেরা ও সিডনি, কানাডার অটোয়া ও টরন্টো, জাপানের টোকিও, যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক, মিয়ামি, ওয়াশিংটন ডিসি ও লস অ্যাঞ্জেলেস, মালদ্বীপের মালে, ওমানের মাস্কাট, দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়া, বাহরাইনের মানামা, সিঙ্গাপুর এবং সুইডেনের স্টকহোম।
ইসি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২ নভেম্বর পর্যন্ত বিদেশের মিশনগুলোতে ৬৫ হাজার ৯৫৯ জনের বায়োমেট্রিক তথ্য নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৫০ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য আপলোড করা হয়েছে। আপলোডের অপেক্ষায় রয়েছে আরও ৮ হাজার ৭৬৩ জনের তথ্য।
তদন্ত শেষে ৫৯ হাজার ৩১৭টি আবেদন অনুমোদন করা হয়েছে। অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে ২ হাজার ১৩২টি আবেদন। আর তদন্তে ৩৭ হাজার ৬৯২টি আবেদন বাতিল হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনার আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেন, বিশ্বে প্রায় ১ কোটি ৪০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি রয়েছেন। তাঁদের বাদ দিয়ে এনআইডি কার্যক্রম পরিচালনা করা সম্ভব নয়। এ কারণে কেউ কেউ দেশে এসে এনআইডি করেন। প্রবাসেও যাতে তাঁরা এ সেবা পান, সে জন্য সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছে।
তিনি বলেন, ‘এখন আমরা স্পেন, জার্মানি ও হংকংয়ে কাজ শুরুর অনুমোদন দিয়েছি। একেক সময় ইসি সচিবালয় ও এনআইডি উইংয়ের একেকটি দল যাবে। চলতি মাসে দুটি দল যাবে। ওই দল আসার পর আবার আরেকটি দল যাবে।’
বাহরাইনে এনআইডি সেবা চালুর অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রবাসীদের মধ্যে এ সেবা নিয়ে বেশ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। তাঁরা যাতে কাছাকাছি জায়গায় গিয়ে নিবন্ধন, বায়োমেট্রিক তথ্য ও ছবি দিতে পারেন, সে ব্যবস্থা করা হচ্ছে।দূতাবাস ও মিশনে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপনের পর কারিগরি দল গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেবে এবং প্রবাসীদের নিবন্ধনে উৎসাহিত করবে। নিবন্ধনের পর দেশে তদন্ত শেষে দ্রুত তাঁদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে এনআইডি দেওয়া হবে।
প্রবাসে এনআইডি সেবা চালুর ইতিহাস
২০০৭-২০০৮ সালে ছবিসহ ভোটার তালিকা প্রণয়নের উদ্যোগের সময় থেকেই প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি দেওয়ার দাবি ওঠে।দীর্ঘদিন নানা জটিলতা পেরিয়ে তৎকালীন কে এম নূরুল হুদা কমিশনের সময় এ কার্যক্রম শুরু হয়।
নির্বাচন কমিশন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে প্রাথমিকভাবে ৪০টি দেশে প্রবাসীদের নিবন্ধনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। এসব দেশের মধ্যে ছিল সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, ওমান, কাতার, বাহরাইন, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাজ্য, ইতালি, হংকং, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, স্পেন, জার্মানি, দক্ষিণ আফ্রিকা, ফ্রান্সসহ আরও কয়েকটি দেশ।
২০১৯ সালের নভেম্বরে মালয়েশিয়ায় অনলাইন নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করে ইসি। তবে করোনাভাইরাস মহামারির কারণে সেই উদ্যোগ থমকে যায়। পরে আবার কার্যক্রম শুরুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও গত কমিশনের সময় ২০২৩ সালের জুলাইয়ে তা গতি পায়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর আবারও এ কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দেয়। পরে বর্তমান এ এম এম নাসির উদ্দিন কমিশন দায়িত্ব নিয়ে কার্যক্রম পুনরায় শুরু করে।
এর ধারাবাহিকতায় বর্তমানে ১৭টি দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি সেবা চালু রয়েছে।
এদিকে, নির্বাচন কমিশনের অধীনে প্রথমবারের মতো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।


