লন্ডনের বিখ্যাত ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবেতে প্রায় ২০০ বছর আগে পাওয়া গিয়েছিল একটি পাথরের কফিন। প্রায় ১ হাজার ৭০০ বছরের পুরোনো কফিনটির ভেতরে কার কঙ্কাল রয়েছে, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রহস্য ছিল। এবার নতুন গবেষণায় প্রত্নতাত্ত্বিকেরা ধারণা করছেন, কঙ্কালটি মধ্যযুগে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবের দায়িত্বে থাকা কোনো মঠপ্রধানের (অ্যাবট)।
১৮২০ সালে প্রথম কফিনটি আবিষ্কৃত হয়। গবেষকদের মতে, এটি তৈরি হয়েছিল রোমান যুগে, আনুমানিক চতুর্থ শতাব্দীতে। কফিনের গায়ে লাতিন ভাষায় একটি শিলালিপি রয়েছে। এতে লেখা, ‘ভ্যালেরিয়াস আমান্দিনাসের স্মৃতির উদ্দেশে’। ধারণা করা হয়, আমান্দিনাস ছিলেন তৎকালীন লন্ডনের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি। তবে তার সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
কফিনটির ঢাকনায় খোদাই করা একটি ক্রুশ রহস্য আরও বাড়িয়ে দেয়। প্রায় ১ দশমিক ৮ মিটার দীর্ঘ ক্রুশটি অ্যাংলো-স্যাক্সন যুগের শেষ দিকের। অর্থাৎ কফিনটি তৈরির অন্তত ৬০০ বছর পর এটি খোদাই করা হয়েছিল। ফলে প্রশ্ন ওঠে, রোমান যুগের কফিনে পাওয়া কঙ্কালটিও কি একই সময়ের?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে নতুন করে কঙ্কালটি পরীক্ষা করেন ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবের পরামর্শক প্রত্নতাত্ত্বিক ওয়ারউইক রডওয়েল। তাঁর গবেষণার ফল গত ২০ অক্টোবর জার্নাল অব দ্য ব্রিটিশ আর্কিওলজিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন-এ প্রকাশিত হয়েছে।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, কঙ্কালটি একজন পুরুষের। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল আনুমানিক ৩৫ থেকে ৪৯ বছর। রেডিওকার্বন পরীক্ষায় জানা গেছে, তাঁর মৃত্যু হয়েছিল ৯৮৭ থেকে ১০৫২ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে। অর্থাৎ কফিনটি রোমান যুগের হলেও এর ভেতরে সমাহিত ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছে কয়েক শতাব্দী পরে।
কঙ্কালটির প্রায় ৯০ শতাংশ অক্ষত অবস্থায় পাওয়া গেছে। হাড়ে পুরোনো ভাঙন, বাত ও গাউটের চিহ্ন থাকলেও গুরুতর কোনো রোগ বা আঘাতের প্রমাণ মেলেনি, যা তাঁর মৃত্যুর কারণ হতে পারে।
কফিনের ভেতরে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পেয়েছেন গবেষকেরা। কঙ্কাল সরিয়ে মাটি ও ধ্বংসাবশেষ পরিষ্কারের পর সেখানে চুনের তৈরি একটি আয়তাকার স্তর দেখা যায়। গবেষকদের ধারণা, মৃতদেহটি প্রথমে কাঠের কফিনে রাখা হয়েছিল। এরপর সেই কফিনে চুন ঢেলে পাথরের বড় কফিনের ভেতরে স্থাপন করা হয়। মধ্যযুগে এ ধরনের সমাধি সাধারণত উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য ব্যবহৃত হতো।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে গবেষকেরা মনে করছেন, কঙ্কালটি ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ব্যক্তির হতে পারে। সম্ভাব্য পরিচয় হিসেবে উঠে এসেছে সে সময়ের দুই মঠপ্রধান অ্যলফউইগ ও উলফনথের নাম।
৯৯৩ সাল থেকে আনুমানিক ১০২০ সাল পর্যন্ত মঠপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন অ্যলফউইগ। এরপর ১০২০ সালে দায়িত্ব নেন উলফনথ। গবেষকদের মতে, অ্যলফউইগের সঙ্গে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবের সম্পর্ক আগে থেকেই থাকায় কঙ্কালটি তাঁর হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক বেশি।
তবে কফিনের ভেতরে মধ্যযুগীয় একজন মঠপ্রধানের কঙ্কাল এল কীভাবে, সেই প্রশ্নও রয়েছে। গবেষকদের ব্যাখ্যা, সে সময় পাথরের কফিন তৈরি প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ফলে পুরোনো রোমান কফিন সংগ্রহ করে পুনরায় ব্যবহার করা হতো। এমন একটি কফিন পাওয়া তখন বিশেষ মর্যাদার বিষয় ছিল।
১৮২০ সালে প্রথম আবিষ্কারের পর খননকাজের সময় কফিনটির ঢাকনা ছয় টুকরো হয়ে যায়। কঙ্কালটিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে হাড়গুলো এলোমেলো অবস্থায় রেখেই কফিনটি আবার মাটিচাপা দেওয়া হয়। ১৮৬৯ সালে সংস্কারকাজের সময় এটি দ্বিতীয়বার আবিষ্কৃত হয়। এরপর বিভিন্ন সময়ে অ্যাবের একাধিক স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
গবেষক রডওয়েল জানিয়েছেন, কোনো একটি সূত্রের ভিত্তিতে কঙ্কালটির পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। বরং কঙ্কালের বয়স, সমাধির ধরন, চুনের ব্যবহার এবং কফিনের ঢাকনায় থাকা ক্রুশসহ বিভিন্ন তথ্য মিলিয়ে এই ধারণা তৈরি হয়েছে।
কঙ্কালটি অ্যলফউইগের কি না, তা নিশ্চিত হতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবে নতুন এই অনুসন্ধানে প্রায় ২০০ বছর ধরে চলা রহস্যের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র মিলেছে। একই সঙ্গে ওয়েস্টমিনস্টার অ্যাবের মধ্যযুগীয় ইতিহাসের একটি অজানা অধ্যায় সম্পর্কেও নতুন ধারণা পাওয়া গেছে।


