চলতি বছর ইউরোপে সামগ্রিক খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধি তুলনামূলকভাবে সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও তাজা কৃষিপণ্য (ফ্রেশ ফুড) ক্রমেই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ফ্রান্সে এ ধরনের পণ্যের দাম বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় দক্ষিণ ইতালির সুপারমার্কেটগুলোর তাকগুলো কার্যত খালি হয়ে পড়েছে।
অক্টোবরের শেষের দিকে ইতালির নেপলস কিংবা দক্ষিণাঞ্চলের যেকোনো সুপারমার্কেটে ঢুকলেই চোখে পড়েছে ফলের তাকগুলোর অর্ধেকের বেশি ফাঁকা পড়ে থাকার দৃশ্য।
ডিজেলের চড়া দামের প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ লরি চালকেরা প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে দক্ষিণ ইতালির বিভিন্ন সড়ক ও বন্দর অবরোধ করে রাখেন।
এর ফলে গুদামগুলো থেকে পণ্য সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। কাম্পানিয়া, পুলিয়া এবং ক্যালাব্রিয়ার মতো অঞ্চলগুলোতে মাংস, তরল দুধ, তাজা ফলমূল ও বোতলজাত পানির তাকগুলো দ্রুত খালি হয়ে যায়; এমনকি কিছু ছোট দোকানে মাত্র এক দিনের ব্যবধানেই সব পণ্য ফুরিয়ে যায়।
ইতালির জাতীয় পরিসংখ্যান সংস্থা ‘ইস্তাত’ (Istat)-এর প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে দেশটিতে প্রক্রিয়াজাতহীন খাদ্যের (শাকসবজি, ফলমূল, কাঁচা মাংস ইত্যাদি) দাম এক বছর আগের তুলনায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে; সেপ্টেম্বরে যা ছিল ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। এছাড়া খাদ্যপণ্য, গৃহস্থালি ও ব্যক্তিগত প্রসাধন সামগ্রী মিলিয়ে সাধারণ খরচের ঝুড়িতে মূল্যবৃদ্ধি ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ২ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
ইতালির পরিস্থিতি চরম পর্যায়ের হলেও এটি মূলত পুরো ইউরোপজুড়েই ঘটতে থাকা এক বৃহত্তর সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে: দীর্ঘ এক বছর বাজার শান্ত থাকার পর নিত্যদিনের মুদি কেনাকাটার খরচ আবারও বাড়তে শুরু করেছে।
জ্বালানির মূল্যে উল্লম্ফন, খাদ্যে ধীর প্রবৃদ্ধি
ইউরোস্ট্যাটের প্রকাশিত প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, অক্টোবরে ইউরোজোনে মূল্যস্ফীতি পৌঁছেছে ৪ শতাংশে, যা গত তিন বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।মূল্যস্ফীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল জ্বালানি খাত। সেখানে জ্বালানি তেল, বিদ্যুৎ এবং ঘর উষ্ণ রাখার খরচ (হিটিং) এক বছর আগের তুলনায় ২০ দশমিক ৮ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
জ্বালানির তুলনায় খাদ্যপণ্যের সার্বিক মূল্যবৃদ্ধি ছিল বেশ ধীরগতির। ইউরোজোনে অক্টোবরে খাদ্য, অ্যালকোহল ও তামাকজাত পণ্যের দাম এক বছর আগের চেয়ে ১ দশমিক ৬ শতাংশ বেড়েছে। এছাড়া পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্ষেত্রে সেপ্টেম্বর মাসে খাদ্য ও কোমল পানীয়ের দাম বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ।
তবে একটু গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, অ্যালকোহল ও তামাকের দাম অক্টোবরে মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বাড়লেও ফল, শাকসবজি, কাঁচা মাংস ও মাছের মতো কাঁচা ও পচনশীল খাদ্যের দাম বেড়েছে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ; যা আগস্টে ছিল ২ দশমিক ৭ শতাংশ।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের প্রধান ইতালি অর্থনীতিবিদ নিকোলা নোবিলে ইমেইলে দেওয়া মন্তব্যে বলেন, ‘জ্বালানি ও তাজা খাদ্যপণ্যের দামই মূল্যস্ফীতিকে ওপরের দিকে টেনে নিয়েছে; তবে চলমান জ্বালানি ধাক্কার মধ্যেও মূল মূল্যস্ফীতি (কোর ইনফ্লেশন) মোটামুটি স্থিতিশীল রয়েছে।
খামারের পণ্য কীভাবে দোকানের তাকে পৌঁছায় তা বিবেচনা করলে এই মূল্যবৃদ্ধির কারণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কৃষিকাজের ট্র্যাক্টর চলে ডিজেলে, গ্রিনহাউস উষ্ণ রাখতে প্রচুর জ্বালানি লাগে এবং প্রায় সব খাবারই লরিতে করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবহণ করা হয়। পরিবহণ ও জ্বালানি খরচ বেড়ে গেলে পচনশীল কৃষিপণ্য সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ে; কারণ এই পণ্যগুলো মাসের পর মাস গুদামে ফেলে রাখা যায় না।
বড় অর্থনীতিগুলোতেও একই প্রবণতা
ফ্রান্সের পরিসংখ্যান ব্যুরো ‘ইনসি’ (INSEE) জানিয়েছে, ফ্রান্সে অক্টোবরে খাদ্যের সামগ্রিক দাম ১ দশমিক ২ শতাংশ বাড়লেও তাজা কৃষিপণ্যের দাম এক বছর আগের চেয়ে ৮ শতাংশ বেড়েছে; যদিও সেপ্টেম্বরে তা ছিল ৯ দশমিক ৫ শতাংশ।
জার্মানিতে খাদ্যের দাম বেড়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে পর্তুগালে প্রক্রিয়াজাতহীন খাদ্যের দাম সেপ্টেম্বরের মতো অক্টোবরেও ৩ দশমিক ৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্পেনেও অক্টোবরে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে, তবে তা আগের বছরের তুলনায় কিছুটা ধীরগতিতে।
কোথায় মূল্যবৃদ্ধি সর্বোচ্চ, কোথায় সর্বনিম্ন?
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সব দেশের তথ্য সংবলিত সর্বশেষ সেপ্টেম্বরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ক্রেতারা সবচেয়ে বেশি আঘাত পেয়েছেন সাইপ্রাসে। দেশটিতে খাদ্য ও কোমল পানীয়ের দাম আগের বছরের চেয়ে সর্বোচ্চ ৪ শতাংশ বেড়েছে। এরপরই রয়েছে স্পেন (২.৭%), রোমানিয়া (২.৬%), মাল্টা (২.৫%) এবং পর্তুগাল (২.৪%)। ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরে তুরস্কে এই হার ছিল মারাত্মক—এক বছরে দেশটিতে খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ।
তবে স্বস্তির বিষয় হলো, ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশের মধ্যে ১৪টি দেশেই খাদ্য ও পানীয়ের দাম আগের বছরের তুলনায় কমেছে।
সবচেয়ে বড় পতন দেখা গেছে সুইডেনে; সেখানে খাদ্যপণ্যের দাম কমেছে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ। মূলত সরকারের ভ্যাট কমানোর সিদ্ধান্তের ফলেই এটি সম্ভব হয়েছে। ১ এপ্রিল থেকে খাদ্যের ওপর ভ্যাট ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৬ শতাংশ করেছে সুইডেন সরকার, যা ২০২৭ সালের শেষ পর্যন্ত বহাল থাকবে। এছাড়া লাটভিয়া, হাঙ্গেরি এবং চেক প্রজাতন্ত্রেও খাদ্যপণ্যের দাম ৩ দশমিক ৮ থেকে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।


