কোনো সুবিধাভোগী যাতে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন না হন—সেই শর্ত দিয়ে পর্তুগাল সরকারের নতুন ‘একক সামাজিক সুবিধা’ বা পিএসইউ বিলটি অনুমোদন করেছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও জোসে সেগুরো। এর মাধ্যমে পর্তুগাল ইউরোপীয় ইউনিয়নের পুনরুদ্ধার তহবিল থেকে প্রায় ৬২ কোটি ইউরো পাওয়ার পথ সুরক্ষিত করল।
‘প্রেস্তাসাঁও সোসিয়াল ইউনিক’ (পিএসইউ) বা একক সামাজিক সুবিধা নামক এই সংস্কারের আওতায় বিদ্যমান ১৩টি নন-কন্ট্রিবিউটরি (অবদানহীন) সামাজিক ভাতাকে একটি একক ভাতার অধীনে নিয়ে আসা হবে, যা পরিবারের আয়, আকার ও সামগ্রিক পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে হিসাব করা হবে।
পর্তুগাল তাদের পুনরুদ্ধার ও স্থিতিস্থাপকতা পরিকল্পনা-এর অংশ হিসেবে আগামী ৩১ আগস্টের মধ্যে এই সংস্কার বিলটি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এই সংস্কার অনুমোদন ও বাস্তবায়নের ওপরই মূলত আনুমানিক ৬০ থেকে ৬২ কোটি ইউরোর পিআরআর তহবিল পাওয়ার বিষয়টি নির্ভরশীল ছিল।
প্রেসিডেন্ট সেগুরোর এই অনুমোদনের ফলে সরকারের সামনে থাকা একটি বড় এবং ব্যয়বহুল বাধা দূর হলো। তবে প্রেসিডেন্ট স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, ব্রাসেলসকে সন্তুষ্ট করা বা সামাজিক কল্যাণ ব্যবস্থাকে সহজ করার মানে এই নয় যে দেশের দুর্বল নাগরিকদের সামাজিক সুরক্ষার পরিমাণ হ্রাস পাবে।
‘সহজীকরণের কোনো প্রক্রিয়াই সামাজিক সুরক্ষা হ্রাসের কারণ হতে পারে না,’ বলেন তিনি।
এই নতুন পিএসইউ ব্যবস্থার অধীনে—সামাজিক একীকরণ আয়, সামাজিক বেকারত্ব সুবিধা, সামাজিক বার্ধক্য ও বিধবা পেনশন, অনাথ বা এতিমদের ভাতা এবং মাতৃত্বকালীন ছুটি, প্রতিবন্ধী ও গর্ভাবস্থার সাথে যুক্ত বেশ কয়েকটি নন-কন্ট্রিবিউটরি সামাজিক ভাতা একীভূত করা হবে।
সরকার জানিয়েছে, নতুন এই ব্যবস্থার ফলে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমবে, নিয়মকানুন সহজ হবে এবং সাধারণ মানুষের জন্য তাঁদের প্রাপ্য সামাজিক সহায়তা পাওয়া আরও সহজ হবে।
এর রেফারেন্স বা ভিত্তি মূল্য পর্তুগালের সামাজিক সহায়তা সূচকের (আইএএস) ৫০ শতাংশ নির্ধারণ করা হবে, যা ২০২৬ সালে প্রায় ২৬৮.৬০ ইউরোর সমান। প্রতিটি পরিবারের আয়ের পরিমাণ, আকার এবং প্রযোজ্য সাপ্লিমেন্ট অনুযায়ী ভাতার পরিমাণ ভিন্ন হবে।
সরকারের দাবি, এই সংস্কারের ফলে বার্ষিক সামাজিক খাতে অতিরিক্ত ৩ কোটি (€৩০ মিলিয়ন) ইউরোর বেশি ব্যয় হবে। এ ছাড়া ১৩টি পৃথক আইটি সিস্টেমের পরিবর্তে একটি সমন্বিত কম্পিউটার প্ল্যাটফর্ম ব্যবহারের ফলে বছরে প্রায় ৩২ লাখ ইউরো সাশ্রয় হবে।
সতর্ক করে দিয়ে সেগুরো বলেন, এই সংস্কারটি মূলত ‘সঠিক দিকের একটি পদক্ষেপ’। তবে এর আসল কার্যকারিতা নির্ভর করবে এর বিস্তারিত নিয়মকানুন ও বাস্তবায়নের পদ্ধতির ওপর।
তিনি জোরালোভাবে বলেন, রূপান্তর প্রক্রিয়ার নিয়ম অবশ্যই এটি নিশ্চিত করবে যেন ‘বর্তমানে যারা সুবিধা পাচ্ছেন, তাঁদের কেউই যেন কোনো ধরনের আর্থিক ক্ষতির শিকার না হন’।
প্রেসিডেন্ট বিশেষ করে ‘সবচেয়ে দুর্বল, স্বল্প আয়ের পরিবার, প্রবীণ ব্যক্তি, প্রতিবন্ধী এবং যারা চরম সংকটের মধ্যে বসবাস করছেন’ তাঁদের জন্য বিশেষ সুরক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন।
পিএসইউ অনুমোদনকারী আইনে বলা হয়েছে যে, নতুন ব্যবস্থাটি কোনোভাবেই পূর্ববর্তী ভাতার চেয়ে কম সুবিধাজনক হতে পারবে না। এটি আগামী ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ কার্যকর হবে এবং বিদ্যমান সুবিধাভোগীদের জন্য রূপান্তরের বিশেষ ব্যবস্থা থাকবে।
সেগুরোর এই সতর্কতা মূলত এই উদ্বেগ থেকে এসেছে যে—ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতির জন্য তৈরি আলাদা আলাদা ১৩টি ভাতাকে একটি একক ব্যবস্থায় রূপান্তর করার ফলে সামগ্রিক সামাজিক ব্যয় বৃদ্ধি পেলেও এককভাবে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
তিনি অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার একটি সাম্প্রতিক গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে দেখান যে, পর্তুগিজ সামাজিক সুবিধাগুলো এখনও তুলনামূলকভাবে কম, যা দারিদ্র্য ও সামাজিক বর্জন সম্পূর্ণরূপে প্রতিরোধ করার জন্য পর্যাপ্ত নয়।
প্রেসিডেন্টের মতে, এই দুর্বলতাই প্রমাণ করে যে ব্যবস্থাটি সহজ করার অর্থ যেন কোনোভাবেই সামাজিক সহায়তা প্রত্যাহার করা না হয়।
এ ছাড়া স্থানীয় পরিষদ বা পৌরসভাগুলোর ওপর এই সংস্কারের কারণে আরোপিত অতিরিক্ত দায়িত্বগুলোর বিষয়েও দ্বিতীয় একটি সতর্কবার্তা জারি করেছেন সেগুরো।
তিনি বলেন, পৌরসভাগুলোকে তাদের ওপর অর্পিত নতুন কাজগুলো সম্পাদন করার জন্য প্রয়োজনীয় কর্মী, সম্পদ এবং তহবিল দিতে হবে।
এর আগে কেন্দ্রীয় সরকার থেকে স্থানীয় সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের সময়ও প্রেসিডেন্ট একই যুক্তি দিয়েছিলেন যে, পৌরসভার অতিরিক্ত দায়িত্বের সাথে ‘অবশ্যই প্রয়োজনীয় সম্পদ ও আর্থিক তহবিলের জোগান নিশ্চিত করতে হবে’।
যেহেতু ডিক্রি-আইনটি এখন অনুমোদিত হয়েছে, তাই সবার মনোযোগ এখন পিএসইউ-এর রূপান্তরের বাস্তব নিয়মকানুনের দিকে। এই ধাপে এসে এটি স্পষ্ট হয়ে যাবে যে—সরকার ১৩টি ভাতার ওপর নির্ভরশীল সাধারণ মানুষদের কাউকেই আর্থিক ক্ষতির মুখে না ফেলার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা তারা পূরণ করতে পারে কি না।


