উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্প্যানিশ ছিটমহল সেউতাকে কোণঠাসা করতে মরক্কো ‘হয়রানিমূলক নীতি’ গ্রহণ করেছে বলে অভিযোগ তুলেছেন সেউতার প্রেসিডেন্ট হুয়ান হেসুস ভিভাস। এই পরিস্থিতিতে নিজের দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে স্পষ্ট দ্বিমত পোষণ করে মরক্কোর বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে এবং সীমান্ত সুরক্ষায় অর্থায়ন করতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
গত মঙ্গলবার ব্রাসেলসে তিনজন ইইউ কমিশনার ও কয়েকজন আইনপ্রণেতার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন ভিভাস। সেখানে অনিয়মিত অভিবাসীদের ফেরত পাঠানো এবং সেউতায় স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরিয়ে আনতে সহায়তা চেয়ে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘সেউতা এখন পতনের দ্বারপ্রান্তে।’ গত ৩০ জুলাই প্রায় ৮০ হাজার অভিবাসী এই ছিটমহলে প্রবেশের পর সেখানে তীব্র মানবিক সংকট তৈরি হয়। এখনো অভিভাবকহীন অপ্রাপ্তবয়স্কসহ হাজার হাজার বিদেশি নাগরিক শহরটিতে অবস্থান করছেন।
এই ইস্যুতে স্পেনের জাতীয় সরকারের অবস্থানের সঙ্গে প্রকাশ্য দূরত্ব তৈরি করেছেন সেউতার এই নেতা। প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজের প্রশাসনের কড়া সমালোচনা করে তিনি বলেন, জুলাইয়ের ঘটনার আগে, চলাকালীন এবং পরেও সানচেজ সরকার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। ওই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার সময় সাগরে ডুবে ১৫০ জনেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল।
ইউরোপীয় পার্লামেন্টে এক সংবাদ সম্মেলনে ভিভাস বলেন, ‘মরক্কোকে ইইউর পরিষ্কার জানিয়ে দেওয়া উচিত যে যেকোনো ফলপ্রসূ ও পারস্পরিক সহযোগিতার শুরু হতে হবে আমাদের সীমান্তকে সম্মান জানানোর মধ্য দিয়ে।’ সেখানে মধ্য-ডানপন্থি ইপিপির আইনপ্রণেতারা তাঁকে সমর্থন জানান।
স্পেন নিজের ভূখণ্ডের অখণ্ডতা লঙ্ঘিত হয়েছে বলে স্বীকার করলেও এই সংকটের জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে মরক্কোকে দায়ী করেনি। বরং মাদ্রিদ সরকার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব ও মানব পাচারকারীদের দায়ী করে রাবাতকে অভিবাসন মোকাবিলার ‘বিশ্বস্ত অংশীদার’ হিসেবে উল্লেখ করে আসছে। ইউরোপীয় কমিশনও একই মনোভাব পোষণ করে।
তবে স্প্যানিশ পুলিশের একটি ফাঁস হওয়া প্রতিবেদনে মরক্কোর নিরাপত্তা বাহিনীর জড়িত থাকার ইঙ্গিত পাওয়ার কথা উল্লেখ করে ভিভাস প্রশ্ন তোলেন, ‘এই অনুপ্রবেশের পেছনে প্রত্যক্ষ ভূমিকা বা নিষ্ক্রিয়তার জন্য মরক্কোকে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে সরকার কেন অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, তা তাদের ব্যাখ্যা করা উচিত।’ তিনি জানান, নতুন করে বড় ধরনের অনুপ্রবেশের আশঙ্কায় সেউতার সাধারণ নাগরিকেরা এখন চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
অবশ্য স্পেনের কট্টর ডানপন্থি দল ভক্স (Vox)-এর মতো মরক্কোকে দেওয়া ইইউ সহায়তা বাতিলের সরাসরি দাবি জানাননি ভিভাস। উল্লেখ্য, ২০২৭ সাল পর্যন্ত অভিবাসন ব্যবস্থাপনার জন্য মরক্কোকে ১৬ কোটি (১৬০ মিলিয়ন) ইউরো দিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। তবে ভিভাস সেউতার সীমান্ত অবকাঠামো নির্মাণ এবং মানবিক সংকট সামাল দিতে ইউনিয়নের পক্ষ থেকে সরাসরি আর্থিক তহবিল চেয়েছেন।
ভিভাস জানান, ইইউ কমিশনার অ্যান্ড্রিয়াস কুবিলাস, ম্যাগনাস ব্রুনার এবং ডুব্রাভকা সুইকা সেউতার প্রতি সমর্থন জানালেও কমিশন তাৎক্ষণিকভাবে সুনির্দিষ্ট কোনো আর্থিক প্রতিশ্রুতি দেয়নি। তবে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি মূল্যায়নে চলতি সপ্তাহেই ব্রাসেলস থেকে একটি কারিগরি প্রতিনিধি দল সেউতায় পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে কমিশন।
আফ্রিকা মহাদেশের সঙ্গে ইউরোপের একমাত্র স্থল সীমান্ত হওয়ায় মেলিয়ার পাশাপাশি সেউতাকেও ইইউর ভেতরে একটি ‘বিশেষ মর্যাদা’ দেওয়ার দাবি জানান ভিভাস। একই সঙ্গে তিনি ইউরোপীয় সীমান্ত সংস্থা ফ্রন্ট্যাক্স (Frontex) এবং ইইউ আশ্রয় সংস্থার (EUAA) স্থায়ী উপস্থিতির তাগিদ দিয়ে বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতি আর মেনে নেওয়া যায় না। স্বাভাবিক অবস্থা ফেরাতে আমাদের ইইউর সার্বিক সমর্থন দরকার। মনে রাখতে হবে, সেউতার পতন হলে কিন্তু ইউরোপেরও পতন হবে।’


