জলবায়ুর পরিবর্তনশীল রূপ ‘এল নিনো’ আগামী মাসগুলোতে আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে বিগত ৪০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র এল নিনোর মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বিশ্ব। জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) এই সতর্কবার্তা দিয়েছে। এক সংবাদ সম্মেলনে ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্টে সাওলো বলেন, ‘জলবায়ুর এই ধরনটির রেকর্ড রাখা শুরু হওয়ার পর থেকে আমরা যা দেখেছি, বর্তমান পরিস্থিতি তার চেয়েও তীব্র হতে পারে। এটি গত চার দশক ধরে আমাদের ব্যবহৃত গ্রাফের সীমাকেও ছাড়িয়ে গেছে।’
গত বৃহস্পতিবার ডব্লিউএমও সতর্ক করে জানায়, এল নিনো ইতিমধ্যে ‘শক্তিশালী অবস্থানে’ পৌঁছেছে এবং আগামী মাসগুলোতে এর তীব্রতা আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমনকি ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এর প্রভাব স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা ‘প্রায় শতভাগ’।
এদিকে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস জোর দিয়ে বলেছেন, চরম আবহাওয়ার কারণে বিশ্ব বর্তমানে একটি ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘বিজ্ঞান এখন স্পষ্ট করে বলছে যে আমাদের এই গ্রহ অজানা পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং সমুদ্রের পানি উত্তপ্ত হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে, থার্মোমিটারের পারদ ক্রমাগত বাড়ছে। চরম আবহাওয়া এখন এক স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়েছে এবং আমরা এক বিপজ্জনক জোনে অবস্থান করছি।’ গুতেরেস আরও জোর দিয়ে বলেন, ‘এল নিনোর এই ব্যতিক্রমী রূপ মোকাবিলায় আমাদের ব্যতিক্রমী প্রস্তুতি ও প্রতিক্রিয়া দেখানো প্রয়োজন।’
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত পরিবর্তন, যা সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পর পর ফিরে আসে। এই প্রক্রিয়ায় বসন্তকালে প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব বিষুবীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি উষ্ণ হতে শুরু করে। এর ফলে পরবর্তী মাসগুলোতে বিশ্বজুড়ে বাতাস, বায়ুচাপ এবং বৃষ্টিপাতের ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন আসে।
বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগরের বিষুবীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি রয়েছে এবং তা ক্রমাগত বাড়ছে। ডব্লিউএমওর তথ্যমতে, ২০২৬ সালের মে থেকে জুলাইয়ের মধ্যে গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ১.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল, যা জুলাই মাসে বেড়ে ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে দাঁড়ায়। জুলাইয়ের শেষ থেকে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২.২ থেকে ২.৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি রেকর্ড করা হয়েছে, যা এই প্রক্রিয়ার অব্যাহত শক্তিশালী হওয়াকেই প্রমাণ করে।
এমনকি সমুদ্রের তলদেশের কিছু কিছু অঞ্চলে জুলাই এবং আগস্টের শুরুতে তাপমাত্রা স্বাভাবিক গড়ের চেয়ে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি উষ্ণ ছিল।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর মাসের জন্য ডব্লিউএমওর পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, বিশ্বের প্রায় সব স্থলভাগেই স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা থাকার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এল নিনোর প্রভাব শেষ হওয়ার পরবর্তী বছরে সমুদ্রের তলদেশে জমে থাকা তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে, যা মূলত বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। এ কারণে অনেক জলবায়ু বিজ্ঞানী ধারণা করছেন যে, ২০২৭ সালটি হবে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম বছর। এর আগে সর্বশেষ এল নিনোর প্রভাবে ২০২৪ সালকে এখন পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণতম বছর হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।


