স্পেনের উত্তর আফ্রিকান ছিটমহল সেউতায় অভিবাসীদের মারধর, অবমাননা, তাৎক্ষণিক বহিষ্কার এবং জাতিগত বৈষম্যের তথ্য নথিভুক্ত করার কথা জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে সামরিক বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছে স্পেন সরকার।
গোড়ালি, বাহু ও বুকে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত হুইলচেয়ারে থাকা এক অভিবাসী জানিয়েছেন, সেনারা তাঁকে ছয় মিটারেরও বেশি উঁচু স্থান থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়। সেউতায় অ্যামনেস্টির সঙ্গে কথা বলার সময় ওই ব্যক্তি অভিযোগ করেন, তাঁর কোনো এক্স-রে পর্যন্ত করানো হয়নি, কেবল প্রাথমিক ব্যান্ডেজ দেওয়া হয়েছে।
অ্যামনেস্টির তদন্তে উঠে আসা অসংখ্য ঘটনার মধ্যে এটি একটি। সংস্থাটির মতে, এসব ঘটনা নির্যাতন এবং অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণের পর্যায়ে পড়ে। সংগৃহীত সাক্ষ্যে লাঠি ও বুটের আঘাত, কেবল টাই (প্লাস্টিকের বাঁধন) দিয়ে হাত-পা বাঁধা, মাথায় আঘাত এবং সিউটা ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি দেওয়ার মতো তথ্য উঠে এসেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, স্প্যানিশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের এই নিপীড়ন ‘একটি নির্দিষ্ট ধরন অনুসরণ করছে’, বিশেষ করে রেগুলারেস এবং লিজিয়ন ইউনিটের অভিযানে তা বেশি দেখা গেছে। এসব ঘটনার নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে সম্ভাব্য ফৌজদারি ও শৃঙ্খলাভঙ্গের দায় নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছে অ্যামনেস্টি।
প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর স্পেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ইউরোরিউজকে জানিয়েছে, বিষয়টি পাবলিক প্রসিকিউটর কার্যালয় এবং সিউটার ডিউটি আদালতে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদার আচরণ ও সুনাম বজায় রাখার স্বার্থে সম্ভাব্য ব্যক্তিগত দায় তদন্ত ও নির্ধারণের জন্য অপারেশন কমান্ডকে আহ্বান জানানো হয়েছে।’
গত ১০ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সেউতায় এই তদন্ত পরিচালিত হয়। অ্যামনেস্টি ৬৫ জনেরও বেশি মানুষের সাক্ষাৎকার নেয় এবং সরাসরি ২২ জনের সাক্ষ্য সংগ্রহ করে। সেখানে সেনারা মারধর, হয়রানি, অবমাননা, অর্থ চুরি এবং মুঠোফোন জব্দ বা ধ্বংসের জন্য দায়ী বলে উল্লেখ করা হয়। সংস্থাটি অভিবাসীদের দেওয়া বর্ণনার সঙ্গে মিলে যাওয়া আঘাতের তথ্যও নথিভুক্ত করেছে।
নথিভুক্ত ঘটনাগুলোর মধ্যে সান আন্তোনিও দে পাদুয়ার চ্যাপেলের কাছে ঘুমন্ত অবস্থায় এক সেনার ধাক্কায় অন্তত ছয় মিটার ওপর থেকে নিচে পড়ে যাওয়ার ঘটনা রয়েছে। মরক্কোর ওই তরুণ জানান, এরপর থেকে তিনি ২৫ দিন ধরে হাঁটতে পারছেন না। আরও দুজন তরুণ জানিয়েছেন, কেবল টাই দিয়ে হাত বেঁধে তাদের ওপর লাঠিপেটা ও কিলঘুষি মারা হয়। অ্যামনেস্টি জানিয়েছে, তারা ওই তরুণদের কব্জিতে বাঁধার ক্ষতের চিহ্ন যাচাই করেছে।
সংস্থাটি সম্ভাব্য বেআইনি বহিষ্কারের তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। অ্যামনেস্টির পাওয়া সাক্ষ্য ও ভিডিও অনুযায়ী, মুখঢাকা পোশাকে থাকা কিছু সেনা রাতে অভিযান চালায় এবং তারা অভিবাসীদের মারধর করে বা জ্বলুনি সৃষ্টিকারী স্প্রে ছিটিয়ে তারাজাল বেড়া পার করে জোরপূর্বক মরক্কোয় ফেরত পাঠায়। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক সুরক্ষার আবেদন জানানোর ইচ্ছা প্রকাশ করা সত্ত্বেও কোনো আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই এক ইয়েমেনি নাগরিককে তাড়িয়ে দেওয়ার ঘটনাও নথিভুক্ত করেছে অ্যামনেস্টি। ওই ব্যক্তির ভাষ্যমতে, আরও কয়েক ডজন মানুষের সঙ্গে তাঁকে সীমান্তে নিয়ে গিয়ে মরক্কোর পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। অ্যামনেস্টি জানিয়েছে, তাঁর বক্তব্যের সমর্থনে প্রমাণপত্র তাদের হাতে এসেছে।
প্রতিবেদনে বর্ণবাদী, অভিবাসীবিরোধী এবং ইসলামবিদ্বেষী হয়রানির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটির মতে, মরক্কোর বংশোদ্ভূত হিসেবে দৃশ্যমান সিউটার স্থানীয় বাসিন্দাদের পরিচয়পত্র পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হচ্ছে এবং শহরের নির্দিষ্ট এলাকা, দোকান ও সুপারমার্কেটে প্রবেশের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে হচ্ছে। অ্যামনেস্টির নিজস্ব প্রতিনিধিদল এমন একটি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হয়েছে। তাদের সফরের সময় নগর কেন্দ্রের কাছে একটি বেঞ্চে বসে কথা বলা একদল মানুষের কাছে কয়েকজন সেনা গিয়ে জিজ্ঞেস করে তারা ‘এখানকার কি না’ এবং তাদের সেখান থেকে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। গবেষকরা চলে যেতে বাধ্য করার কারণ জানতে চাইলে এক সেনা উত্তর দেয়, ‘তারা যেন স্বস্তি বোধ না করে তা নিশ্চিত করার আদেশ আমাদের দেওয়া হয়েছে।’
তদন্ত চলাকালে অ্যামনেস্টির প্রতিনিধিদলও হেনস্তার শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছে। ১১ সেপ্টেম্বর সিউটা ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের আশপাশ থেকে অভিবাসী সন্দেহে ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় ন্যাশনাল পুলিশ অ্যামনেস্টির সদস্যদের পরিচয়পত্র দেখতে চায় এবং সেখানে টহলরত একদল সেনা তাদের অপমান করে।
আশ্রয় পাওয়ার অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়েও সতর্ক করেছে অ্যামনেস্টি। সংস্থাটি সেউতায় সোমালিয়া ও ইয়েমেনের মতো যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলো থেকে ৩০ জুলাইয়ের আগে আসা ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে, যাদের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা প্রক্রিয়া এখনও শুরুই হয়নি। এদের মধ্যে অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ কি না তা যাচাইয়ের জন্য কোনো সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়নি এবং সুরক্ষার আবেদন জানানোর বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্যও দেওয়া হয়নি।
তদন্তে সেউতায় অবস্থানরত অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের পরিস্থিতির ওপরও আলোকপাত করা হয়েছে। অ্যামনেস্টির সংগৃহীত প্রাতিষ্ঠানিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, অভিভাবকহীন ২ হাজার ৩৮৩ জন অভিবাসী শিশুকে শনাক্ত করা হয়েছে এবং তাদের মধ্যে ৫০০ থেকে ৭০০ শিশু কোনো সহায়তা ছাড়াই রাস্তায় দিন কাটাচ্ছে। যাদের কারও কারও বয়স মাত্র ১২ বা ১৩ বছর। অ্যামনেস্টি এমন কিছু অভিভাবকহীন শিশুর সঙ্গে কথা বলেছে যারা সুরক্ষার আশায় প্রায় প্রতিদিনই থানায় যায়, কিন্তু তাদের অভিযোগ অনুযায়ী পুলিশ তাদের ফিরিয়ে দেয়। সংস্থাটি বলছে, অভিভাবকহীন কোনো শিশুকে পেলে যে সুরক্ষামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা, এই আচরণ তা লঙ্ঘন করে।
পরিস্থিতি শত শত নারীর জন্যও সংকটাপন্ন। সংস্থাটির অনুমান, প্রায় ৮০০ নারী (যাদের কারও কারও সঙ্গে সন্তান রয়েছে) খোলা রাস্তায় বসবাস করছেন। সফরকালে এমন পরিবারগুলোকে খোলা আকাশের নিচে কিংবা কোনো গোসলখানা বা শৌচাগারবিহীন অস্থায়ী জায়গায় রাত কাটাতে দেখা গেছে।
তদন্ত শেষে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল স্পেনের প্রধানমন্ত্রী এবং সিউটার প্রেসিডেন্টের কাছে চিঠি পাঠিয়ে তাদের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে এবং জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। সংস্থাটি নির্যাতন বা অন্যান্য নিষ্ঠুর, অমানবিক বা অবমাননাকর আচরণের অভিযোগগুলোর একটি ‘দ্রুত, নিরপেক্ষ, স্বাধীন এবং পুঙ্খানুপুঙ্খ’ তদন্ত দাবি করেছে। একই সঙ্গে সত্যতা উদঘাটন না হওয়া পর্যন্ত হামলায় জড়িত সন্দেহে থাকা সেনাদের সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া এবং সম্ভাব্য অপরাধ ও শৃঙ্খলামূলক দায় নির্ধারণের দাবি জানানো হয়েছে।
তবে সেউতায় মোতায়েন করা সশস্ত্র ও নিরাপত্তা বাহিনীর কঠিন পরিস্থিতির কথাও স্বীকার করেছে সংস্থাটি। সেনাদের ওপর হামলার দায়ে ৩০ জনের বেশি অভিবাসীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলেও উল্লেখ করেছে তারা। তবে সংস্থাটি জোর দিয়ে বলেছে, এই পরিস্থিতি কোনোভাবেই রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আইন এবং মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার বাধ্যবাধকতা থেকে রেহাই দেয় না।


