যুক্তরাজ্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্পন্সরড স্টাডি বা প্রাতিষ্ঠানিক অধ্যয়নের ভিসা আবেদন উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (হোম অফিস) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এ ধরনের ভিসা আবেদন জমা পড়েছে প্রায় ৭১ হাজার ৬০০টি, যা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের তুলনায় ১০ দশমিক ৩ শতাংশ কম।
এই উপাত্ত মূলত সম্ভাব্য আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের করা ভিসা আবেদনগুলোকে নির্দেশ করে, যা কেবল মঞ্জুর হওয়া ভিসা বা যুক্তরাজ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা নয়।
হোম অফিসের তথ্য আরও দেখায়, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শেষ ১২ মাসে প্রধান শিক্ষার্থীদের ভিসা আবেদন মোট ৩ লাখ ৫২ হাজার ৫০০টিতে দাঁড়িয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৯ শতাংশ কম। একই সময়ে শিক্ষার্থীদের ডিপেন্ডেন্ট বা নির্ভরশীলদের আবেদন নেমে এসেছে ১৫ হাজার ৭০০টিতে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩১ শতাংশ এবং ২০২৩ সালের ডিসেম্বরের রেকর্ড স্তরের তুলনায় ৮৯ শতাংশ কম।
মহামারির পরবর্তী সময়ে যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর সংখ্যা সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছেছিল। হোম অফিসের তথ্য অনুসারে, ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত শেষ ১২ মাসে স্পন্সরড স্টাডি ভিসা মঞ্জুরের সংখ্যা রেকর্ড ৬ লাখ ৫২ হাজার ৭২টিতে পৌঁছেছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের জুনের মধ্যে তা ৪১ শতাংশ কমে ৩ লাখ ৮৩ হাজার ৪৫৫টিতে নেমে আসে।
২০২৪ সালের জানুয়ারি থেকে বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর জন্য ডিপেন্ডেন্ট বা পরিবারের নির্ভরশীল সদস্যদের যুক্তরাজ্যে নিয়ে আসার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়। কেবল প্রধানত স্নাতকোত্তর গবেষণার শিক্ষার্থী এবং সরকারিভাবে স্পন্সরপ্রাপ্ত স্কলাররা এর আওতামুক্ত রয়েছেন। এর পাশাপাশি, গত মার্চে আফগানিস্তান, ক্যামেরুন, মিয়ানমার এবং সুদানের শিক্ষার্থীদের ওপর নতুন ভিসা নিয়ন্ত্রণ বা ‘ব্রেক’ আরোপ করে যুক্তরাজ্য। হোম অফিস জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো থেকে এসব রুটে ভিসা আবেদন ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিক থেকে ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকের মধ্যে ৯০ শতাংশেরও বেশি কমে গেছে।
এদিকে হাউস অব কমন্স লাইব্রেরি জানিয়েছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর সেশনের জন্য ইস্যুকৃত পড়াশোনার স্বীকৃতিপত্র বা ‘কনফার্মেশন অব এক্সেপ্টেন্স ফর স্টাডিজ’ (সিএএস) গত বছরের তুলনায় ২৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
এই পতনের মুখে যুক্তরাজ্যের বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কড়াকড়ি ও ভিসা স্পন্সরশিপের নিয়ম কঠোর করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ইউনিভার্সিটি অব সান্ডারল্যান্ড ২০২৭ সালের শুরুর দিকের সেমিস্টারের জন্য নাইজেরিয়া, ঘানা ও কেনিয়াসহ সাব-সাহারান আফ্রিকা অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের আবেদন সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে এবং একই সঙ্গে তাদের বার্ষিক পরিচালন ব্যয় থেকে প্রায় চার কোটি পাউন্ড কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে। অক্সফোর্ড ব্রুকস ইউনিভার্সিটি এবং অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও নাইজেরীয় আবেদনকারীদের জন্য সিএএস ডেডলাইন এগিয়ে আনা এবং নির্দিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে তহবিল প্রমাণের মতো শর্ত কঠিন করেছে।
উচ্চশিক্ষা পরিসংখ্যান সংস্থার (এইচইএসএ) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪/২৫ অর্থবছরে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিউশন ফি বাবদ যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ১ হাজার ২৪০ কোটি (১২.৪ বিলিয়ন) পাউন্ড আয় করেছে, যা তাদের মোট আয়ের প্রায় ২৩ শতাংশ। গবেষণা বলছে, ২০২৪/২৫ শিক্ষাবর্ষে পড়াশোনা শুরু করা ৪ লাখ ৪ হাজার ৫০০ জন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী তাঁদের অধ্যয়নকালে অর্থনীতিতে মোট ৪ হাজার ৫১০ কোটি (৪৫.১ বিলিয়ন) পাউন্ড অবদান রাখবেন। সম্ভাব্য সরকারি খরচ ৪৭০ কোটি (৪.৭ বিলিয়ন) পাউন্ড বাদ দিলে তাদের নিট অর্থনৈতিক অবদান দাঁড়াবে ৪ হাজার ৪০ কোটি (৪০.৪ বিলিয়ন) পাউন্ড বা প্রতি শিক্ষার্থীর জন্য প্রায় ১ লাখ পাউন্ড।
যুক্তরাজ্যে স্থানীয় স্নাতক শিক্ষার্থীদের ফি-র মতো আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট সীমা (ক্যাপ) নেই, ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিদেশি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে উচ্চহারে ফি নিতে পারে। এরই মধ্যে ইংল্যান্ডের ৪৮টি সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত বিশ্ববিদ্যালয় ২০২৪/২৫ অর্থবছরে আর্থিক ঘাটতির মুখোমুখি হয়েছে।
এমন বাস্তবতায় সেপ্টেম্বর মাসের এই পরিসংখ্যান এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের আয়ের প্রায় এক চতুর্থাংশের জোগানদাতা এবং ব্রিটিশ অর্থনীতিতে হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন।


