মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে স্পেনের কৌশলগত অবস্থানের কারণে দেশটির জাহাজগুলোকে বিশ্বখ্যাত ‘হরমুজ প্রণালী’ দিয়ে চলাচলের বিশেষ অনুমতি দিচ্ছে ইরান। যদিও স্পেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিশ্চিত করেনি, তবে স্পেনে নিযুক্ত ইরানি দূতাবাস সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ (সাবেক টুইটার) এই খবরের সত্যতা নিশ্চিত করেছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এবং ১৯ শতাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এই রুট দিয়েই পরিবাহিত হয়। ইরানের এই ‘নির্বাচনী অবরোধ’ কৌশলের ফলে শত্রুভাবাপন্ন দেশগুলোর জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকলেও স্পেনের মতো দেশগুলো বিশেষ সুবিধা পাচ্ছে।
স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের নীতি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি ওয়াশিংটনের নেতৃত্বাধীন সামরিক অভিযানে অংশ নিতে অস্বীকার করেছেন এবং স্পেনে অবস্থিত রোটা ও মোরন সামরিক ঘাঁটিগুলো ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহারের অনুমতি দেননি। সানচেজের এই সিদ্ধান্ত তেহরানের প্রশংসা কুড়ালেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইসরায়েল সরকারের তীব্র ক্ষোভের কারণ হয়েছে। ট্রাম্প ইতিমধ্যে স্পেনের সাথে সমস্ত বাণিজ্য বন্ধ করার এবং কঠোর শুল্ক (ট্যারিফ) আরোপের হুমকি দিয়েছেন। তবে স্পেনের অভ্যন্তরীণ জনমত অনুযায়ী, প্রায় ৫৩.২ শতাংশ নাগরিক মার্কিন সামরিক কাজে স্প্যানিশ ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছেন।
হরমুজ প্রণালীর অস্থিরতার কথা মাথায় রেখে স্পেন তাদের জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিকল্প পথ বা ‘প্ল্যান বি’ নিয়ে কাজ শুরু করেছে। এর অংশ হিসেবে স্পেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হোসে ম্যানুয়েল আলবারেস আলজেরিয়ার সাথে নতুন গ্যাস চুক্তি স্বাক্ষরের জন্য দেশটি সফর করছেন। পশ্চিম সাহারা ইস্যুতে দীর্ঘদিনের টানাপড়েন কাটিয়ে আলজেরিয়ার সাথে সম্পর্ক উন্নয়ন এখন স্পেনের জন্য জরুরি, কারণ দেশটির আমদানিকৃত গ্যাসের প্রায় ৪০ শতাংশই আসে আলজেরিয়া থেকে। মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি মূল্য স্থিতিশীল রাখাই এখন মাদ্রিদের প্রধান লক্ষ্য।
তেহরানের এই অগ্রাধিকারমূলক আচরণ স্পেনের জন্য সাময়িক অর্থনৈতিক স্বস্তি ও কূটনৈতিক বিজয় হিসেবে দেখা দিলেও পশ্চিমা মিত্রদের মধ্যে দেশটি বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। হোয়াইট হাউস ইতিমধ্যে স্প্যানিশ পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ এবং গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান বন্ধের হুমকি দিয়েছে। ইসরায়েল এই অবস্থানকে ‘ইরানি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসবাদের পুরস্কার’ হিসেবে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে, ইরানের অভ্যন্তরীণ দমন-পীড়নের রেকর্ডের কারণে সানচেজের এই নীতি নৈতিকভাবেও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। শেষ পর্যন্ত এই অবস্থান দীর্ঘমেয়াদে আন্তর্জাতিক মিত্রদের সাথে স্পেনের সম্পর্কের কতটা টানাপড়েন সৃষ্টি করে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।


