কোভিড-১৯ মহামারি এবং ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে কয়েক বছর টানা বৃদ্ধির পর, ২০২৫ সালে এসে বিশ্বজুড়ে বৈদেশিক সাহায্য তহবিলে নজিরবিহীন ধস নেমেছে। ওইসিডি-র সর্বশেষ সমীক্ষা অনুযায়ী, বিশ্বের ধনী দেশগুলো দরিদ্র দেশগুলোর জন্য বরাদ্দ তহবিল এমন হারে কমিয়ে দিচ্ছে যা আগে কখনো দেখা যায়নি। ২০২৫ সালে দাতা দেশগুলোর আনুষ্ঠানিক উন্নয়ন সহায়তা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ২৩.১ শতাংশ হ্রাস পেয়ে ১৪৯ বিলিয়ন ইউরোতে নেমে এসেছে। ২০২৬ সালে এই তহবিল আরও ৫.৮ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
এই বিশাল ঘাটতির পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি তাদের বৈদেশিক সাহায্য বাজেট এককভাবে ৫৭ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছে, যা বৈশ্বিক তহবিলের সিংহভাগ ঘাটতির কারণ। এ ছাড়া ইউরোপের প্রভাবশালী দেশ ফ্রান্স ১০.৯ শতাংশ, জার্মানি ১৭.৪ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্য ১০.৮ শতাংশ তহবিল কমিয়ে দিয়েছে। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের বাজেট ১৩.৮ শতাংশ হ্রাস করেছে। এই প্রধান দাতা দেশগুলোর সম্মিলিত কাটছাঁটই মোট বৈশ্বিক অর্থায়ন হ্রাসের ৯৬ শতাংশের জন্য দায়ী।
ওয়াশিংটনের অর্থায়ন নাটকীয়ভাবে কমে যাওয়ার ফলে জার্মানি এখন বিশ্বের বৃহত্তম ওডিএ তহবিলদাতা দেশে পরিণত হয়েছে। ২০২৫ সালে দেশটি ২৪.৮৯ বিলিয়ন ইউরো প্রদান করেছে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র ২৪.৭৭ বিলিয়ন ইউরো নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে। তবে জাতীয় আয়ের শতাংশ হিসেবে সহায়তার তালিকায় বরাবরের মতো নরওয়ে (১.০৩%) শীর্ষে রয়েছে, যার পরেই আছে লুক্সেমবার্গ, সুইডেন ও ডেনমার্ক।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারগুলো বর্তমানে ধীর অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, ক্রমবর্ধমান বয়স্ক জনসংখ্যা এবং প্রতিরক্ষা ও অভ্যন্তরীণ নীতিতে বাড়তি ব্যয়ের চাপের মুখে রয়েছে। ফলে সরকারি অর্থায়নে টান পড়লে উন্নয়ন বাজেটগুলোই সবার আগে কাটছাঁট করা হচ্ছে। ইইউ এক্সটার্নাল অ্যাকশন স্পেশালিস্ট অ্যালেক্সেই জোন্স মনে করেন, এটি একটি গভীর রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিফলন, যেখানে আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগিতা এখন জাতীয় কর্মসূচিতে গুরুত্ব হারাচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী অধিকাংশ দেশ সহায়তা কমালেও এর ব্যতিক্রম দেখিয়েছে স্পেন ও হাঙ্গেরি। দেশ দুটি যথাক্রমে ১০.৭ শতাংশ ও ৪৫.৭ শতাংশ অর্থায়ন বাড়িয়েছে। এ ছাড়া ইতালি, আইসল্যান্ড, নরওয়ে এবং ডেনমার্কও তাদের বাজেট সামান্য পরিমাণে বৃদ্ধি করেছে। তবে সামগ্রিক এই কাটছাঁট দীর্ঘমেয়াদী আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকরা।


