রাশিয়ার মতো বৈরী দেশগুলোর নাগরিকদের ভিসা দেওয়ার ক্ষেত্রে আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ)। গত বৃহস্পতিবার ইউরোপীয় কমিশন জানিয়েছে, সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে থাকা বৈরী দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়া আরও সীমিত করতে একটি নতুন প্রস্তাবনা তৈরি করা হচ্ছে।
ইউরোপীয় কমিশনের স্বরাষ্ট্র বিষয়ক মুখপাত্র মার্কুস ল্যামার্ট ব্রাসেলসে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘তৃতীয় কোনো বৈরী দেশের নানাবিধ পদক্ষেপের কারণে সৃষ্ট নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় আমরা ভিসার ক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়ার একটি প্রস্তাবনা তৈরি করছি।’ তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে বলেন, উদ্দেশ্য হলো সেসব বৈরী দেশের নাগরিকদের ইইউর ভিসা পাওয়ার সুযোগ ‘আরও সীমিত করা’। তিনি আরও যোগ করেন, ‘ইউরোপীয় ইউনিয়নের ভিসা কোড বা নীতিমালার আসন্ন পর্যালোচনার সময় আমরা এই পরিবর্তনগুলো অন্তর্ভুক্ত করব।’
ইইউর পররাষ্ট্র নীতি বিষয়ক প্রধান কায়া কালাসের এক বক্তব্যের পর ল্যামার্ট এই ঘোষণা দিলেন। গত বুধবার আয়ারল্যান্ডের উইকলোতে ইইউর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের এক অনানুষ্ঠানিক বৈঠক শেষে কালাস বলেছিলেন, রাশিয়ার নাগরিকদের পর্যটন ভিসা দেওয়া সীমিত করতে এবং ইউক্রেন যুদ্ধে অংশ নেওয়া সাবেক রুশ সেনাদের ইউরোপে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে ইইউর সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ‘ব্যাপক সমর্থন’ রয়েছে।
ব্রাসেলসের সংবাদ সম্মেলনে মার্কুস ল্যামার্ট উল্লেখ করেন, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই ‘রুশ নাগরিকদের ভিসা দেওয়া সীমিত করা কমিশনের অন্যতম অগ্রাধিকারমূলক কাজ’। তিনি জানান, ২০২২ সালেই ইইউ রাশিয়ার সঙ্গে তাদের ভিসা সহজীকরণ চুক্তি স্থগিত করে এবং ‘রুশ নাগরিকদের ভিসার আবেদনগুলোকে অপেক্ষাকৃত কম অগ্রাধিকার দিতে’ এবং ‘সীমান্তে নিরাপত্তা পরীক্ষা জোরদার করতে’ সদস্য দেশগুলোকে স্পষ্ট নির্দেশনা দেয়।
ল্যামার্ট বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যে এসব উদ্যোগের স্পষ্ট ফলাফল দেখতে পাচ্ছি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে রুশ নাগরিকদের প্রতিবছর প্রায় ৪০ লাখ ভিসা দেওয়া হতো। অথচ গত বছর এই সংখ্যা নেমে এসেছে মাত্র ৬ লাখ ১৮ হাজারে। যা একটি অত্যন্ত স্পষ্ট ও বড় ধরনের হ্রাস।’ তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘ভিসা দেওয়ার এই নিম্নহার বজায় রাখা এবং এটি আরও কমিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি।’ আর এই কারণেই রাশিয়ার নাগরিকদের জন্য ভিসার কড়াকড়ি আরও বাড়াতে কাজ করছে ইইউ।
অবশ্য ল্যামার্ট পরিষ্কার করে বলেন, ভিসা ইস্যু করা মূলত প্রতিটি সদস্য রাষ্ট্রের নিজস্ব এখতিয়ার। প্রতিটি আবেদনই জাতীয় কর্র্তৃপক্ষ ‘কেস-বাই-কেস বা স্বাধীনভাবে মূল্যায়ন’ করে থাকে। তিনি বলেন, ‘স্বাভাবিকভাবেই জাতীয় কর্তৃপক্ষই প্রতিটি পৃথক আবেদন যাচাই করে ভিসা দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।’
অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার স্বার্থে রুশ নাগরিকদের পর্যটন ভিসা দেওয়ায় কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের পক্ষে যুক্তি দিয়ে কায়ো কালাস গত বুধবার জার্মানির একটি ঘটনার উদাহরণ টানেন। জার্মানির লাইপজিগ বিমানবন্দরে ড্রোন ঘটনার সঙ্গে জড়িত অন্যতম রুশ সন্দেহভাজন ব্যক্তি ইতাহির দেওয়া একটি পর্যটন ভিসা ব্যবহার করে ইইউ অঞ্চলে প্রবেশ করেছিলেন বলে জানা গেছে।
কালাস বলেন, ‘এটি খুব স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে ইইউর ক্ষতি করতে চাওয়া ব্যক্তিরা ইউরোপে প্রবেশ করতে এই পর্যটন ভিসাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।’ ইইউর এই শীর্ষ কূটনীতিক মনে করেন, ‘রাশিয়া যখন ইউক্রেনে অনবরত বোমা হামলা চালাচ্ছে এবং জুলাই ও আগস্ট মাসে রেকর্ডসংখ্যক বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছে, তখন রুশ নাগরিকরা এভাবে ইউরোপীয় দেশগুলোর আতিথেয়তা গ্রহণ করবে—এটি স্বাভাবিক বিষয় হতে পারে না।’
তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, ড্রোনের ঘটনার এই তথ্য প্রমাণিত হলে তা ইইউর সেই সদস্য দেশগুলোকেও ভিসা কড়াকড়ি আরোপের পক্ষে রাজী করাবে, যারা আগে এর বিরোধিতা করেছিল। কারণ এটি এখন সমগ্র ইউরোপের নিরাপত্তার বিষয়। ২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে ইউরোপ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সবচেয়ে ভয়াবহ নিরাপত্তা সংকটে পড়েছে।


