ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসের একটি দরিদ্র উপশহরে কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয়গুলো থেকে পাস করার পর বেশ কিছু অভিবাসী তরুণ-তরুণীকে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। চাকরির ভালো সুযোগ পাওয়ার বদলে উল্টো তাদের হাতে ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে নির্বাসনের আদেশ। এতে চরম অনিশ্চয়তা ও হতাশার মধ্যে পড়েছেন ফ্রান্সে বড় হওয়া এই বিদেশী শিক্ষার্থীরা। (পরিচয় গোপন রাখার সুবিধার্থে প্রতিবেদনে শিক্ষার্থীদের আসল নাম পরিবর্তন করা হয়েছে)।
প্যারিসের অন্যতম দরিদ্র এলাকা সাঁ-দেনির কারিগরি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রতি বছর অনেক অভিবাসী সন্তান পড়াশোনা শেষ করছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে কেউ কেউ এখন ফ্রান্স থেকে বহিষ্কারের আদেশ বা ‘ওকিউটিএফ’ (OQTF) চিঠি পাচ্ছেন। যেমন, ২০১৯ সালে ১২ বছর বয়সে তিউনিসিয়া থেকে আসা মারিয়েম (১৯) এখন চিকিৎসাবিদ্যা নিয়ে পড়াশোনা করছেন। তিনি ডাকঘরে গিয়ে এই বহিষ্কারের চিঠি পান। মারিয়েম বলেন, “আমি খুবই কষ্টে ছিলাম এবং বুঝতে পারছিলাম না কী করব। আমি আসলে হতাশায় ভুগছিলাম।”
একই পরিস্থিতি ১৪ বছর বয়সে মরক্কো থেকে আসা মোহাম্মদেরও (১৯)। বর্তমানে ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়া এই শিক্ষার্থীকে জানানো হয়েছে, তিনি পর্যটক ভিসায় আসায় তার কাছে পড়াশোনার সঠিক ভিসা নেই। মোহাম্মদ বলেন, “আমি হতবাক হয়ে বাইরে একটা চেয়ারে বসে শুধু ভাবছিলাম, কেন এমন হলো? আমি কী অপরাধ করলাম?”
শিক্ষাকর্মী ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্রান্সে যেসব কাজের ক্ষেত্রে তীব্র কর্মী সংকট রয়েছে (যেমন চিকিৎসা ক্ষেত্র), সেসব বিষয়ে প্রশিক্ষণরত শিক্ষার্থীদের সুরক্ষার নিয়ম থাকা সত্ত্বেও অনেককে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাবে অনেকে পড়াশোনা বা কাজ কিছুই করতে পারছেন না। সাঁ-দেনিসের একটি কারিগরি স্কুলের একাডেমিক উপদেষ্টা জানান, প্রায় ৫০ জন শিক্ষার্থী কাগজপত্র ঠিক করতে না পারায় ইতিমধ্যেই নির্বাসিত হয়েছে। এই অঞ্চলের আরও প্রায় এক ডজন স্কুল একই সমস্যায় ভুগছে।
১৮ বছর বয়স পর্যন্ত এই শিশুরা নির্বাসন থেকে নিরাপদ থাকলেও, প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর ফ্রান্সের সাথে তাদের সুদৃঢ় সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও তারা আর কোনো আইনি সুরক্ষা পাচ্ছে না।
২২ বছর বয়সী ঘাদার মতো অনেক শিক্ষার্থী নির্বাসনের আদেশ না পেলেও চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। ২০১৯ সালে তিউনিসিয়া থেকে আসা তথ্যপ্রযুক্তির (IT) মেধাবী শিক্ষার্থী ঘাদা গত তিন বছর ধরে একজন আইনজীবীকে নিয়ে কাগজপত্রের চেষ্টা করছেন। উচ্চশিক্ষার জন্য তার দ্রুত এই অনুমতি প্রয়োজন। ঘাদা আক্ষেপ করে বলেন, “আমাদের এই পরিস্থিতির কারণে আমরা কোনো নিয়মের মধ্যে নেই, তাই আমরা মুখ খুলে কথাও বলতে পারি না।”
সাঁ-দেনিস এলাকায় সম্প্রতি বালি বাগায়োকো নামের একজন বামপন্থী নেতা মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর এই শিক্ষার্থীদের মনে কিছুটা আশা জেগেছে। গত মাসে সেখানে একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যেখানে ফরাসি রাজনীতিবিদরা এই অনথিভুক্ত শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। সেখানে শিক্ষার্থীদের একটি আনুষ্ঠানিক সহায়তার প্রমাণপত্র দেওয়া হয়, যা তাদের সাময়িকভাবে ফ্রান্সে থাকার ক্ষেত্রে সাহায্য করবে।
তথ্যসূত্র: আলজাজিরা


