ইউরোপজুড়ে বয়ে যাওয়া রেকর্ডভাঙা তাপদাহের মধ্যে আবহাওয়া বিজ্ঞানীরা এক নতুন বিপদের কথা জানিয়েছেন, যার নাম ‘ট্রপিক্যাল নাইটস’ বা গ্রীষ্মমণ্ডলীয় রাত। ফ্রান্স, স্পেন এবং যুক্তরাজ্যের একটি বিশাল অংশে দিনের বেলার তাপমাত্রা ইতিমধ্যে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি বা ওপরে পৌঁছে গেছে। তবে বিজ্ঞানীদের মতে, এখন দিনের বেলার চেয়েও রাতের বেলার আবহাওয়া মানুষের বেঁচে থাকার জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। আবহাওয়াবিজ্ঞানের ভাষায়, কোনো নির্দিষ্ট এলাকায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে, বিশেষ করে রাতে, তাপমাত্রা যদি কখনোই ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে না নামে, তবে সেই রাতকে ‘ট্রপিক্যাল নাইট’ বলা হয়। ইউরোপের মতো ঠান্ডা অঞ্চলের দেশগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এখন ঘন ঘন এই পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। যুক্তরাজ্যের আবহাওয়া দপ্তর ‘মেট অফিস’-এর একটি গবেষণা অনুযায়ী, আগে ব্রিটেনে টানা ৩ দিন এমন গরম রাত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল ১ শতাংশেরও কম, কিন্তু বর্তমান বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সেই সম্ভাবনা বেড়ে এখন ২০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
রাতের এই চড়া তাপমাত্রা মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠছে। দিনের বেলার প্রচণ্ড গরমের পর মানুষের শরীর মূলত রাতের ঠান্ডা আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে নিজের ভেতরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক করতে এবং ক্লান্তি দূর করতে। কিন্তু রাতেও যদি তাপমাত্রা ২০ ডিগ্রির ওপরে থাকে, তবে শরীর সেই ঠান্ডা হওয়ার সুযোগ পায় না। পরিবেশ স্বাস্থ্য বিজ্ঞানীদের মতে, রাতের এই গরম মানুষের শরীরে ক্রমান্বয়ে তাপের বোঝা বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে হার্টের অসুখ বা হৃদরোগের ঝুঁকি এবং অনিদ্রা মারাত্মক আকার ধারণ করে, যা বিশেষ করে বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এমনকি রাতের গরমের কারণে ঘুম না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার সময়সূচি পরিবর্তনের কথাও ভাবছে বিভিন্ন দেশের স্কুলগুলো।
আমেরিকা বা এশিয়ার তুলনায় ইউরোপের দেশগুলোতে ঘরের ভেতর এসি বা শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ব্যবহারের হার ঐতিহাসিকভাবেই অনেক কম। ১৯৯০ সালের পর এসি ব্যবহার কিছুটা বাড়লেও এখনো ইউরোপের মাত্র ২০ শতাংশ ভবনে এসি রয়েছে। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, এই গরম রাত থেকে বাঁচতে ইউরোপের মানুষ এখন এসির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা একটি অন্তহীন ও আত্মঘাতী চক্র তৈরি করছে। এসি চালানোর জন্য যে বাড়তি বিদ্যুৎ লাগে, তা মূলত কয়লা বা গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি পুড়িয়ে তৈরি হয়। আবার এসি থেকে নির্গত গ্যাস বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের চেয়েও হাজার গুণ বেশি তাপ আটকে রাখে। সেই সাথে শহরের বহুতল ভবন এবং পিচদ্বারা রাস্তাগুলো দিনের বেলা এই তাপ শুষে নেয় এবং রাতে তা বাতাসে ছাড়ে। ফলে বাইরের আবহাওয়া আরও গরম হয়ে ওঠে এবং মানুষ বাধ্য হয়ে আরও বেশি এসি চালায়।
ইউরোপের বর্তমান চিত্র আজ বেশ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ফ্রান্সের অর্ধেকেরও বেশি এলাকায় ‘রেড আলার্ট’ বা সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। প্যারিসের মেয়র সাধারণ মানুষকে একটু স্বতি দিতে শহরের পার্কগুলো ২৪ ঘণ্টা খোলা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন এবং খালের পানিতে নাগরিকদের সাঁতার কাটার অনুমতি দিয়েছেন। পাশাপাশি স্পেনের মাদ্রিদসহ বিভিন্ন এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছুঁয়েছে এবং যুক্তরাজ্যেও তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের রেকর্ড স্পর্শ করতে যাচ্ছে। তবে এই তীব্র গরমের মধ্যেও ইতালি ও গ্রিসের আবহাওয়া তুলনামূলক কিছুটা মৃদু অর্থাৎ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচেই রয়েছে।
তথ্যসূত্র: ইউরো নিউজ


