জার্মানিতে অর্থের বিনিময়ে বা অন্য কোনো উপায়ে নকল বাবা সেজে বিদেশি শিশুদের নাগরিকত্ব পাইয়ে দেওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে একটি নতুন আইন পাস করা হয়েছে। দেশটির সংসদ ‘বুন্ডেসটাগ’ গত ১২ জুন এই বিশেষ আইনটি পাস করে, যা পরদিন অর্থাৎ ১৩ জুন থেকেই দেশটিতে কার্যকর হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, কিছু জার্মান নাগরিক অনেক সময় মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বিদেশি কোনো নারীর সন্তানের আসল বা জৈবিক বাবা না হওয়া সত্ত্বেও কাগজে-কলমে পিতৃত্ব স্বীকার করেন। এর মূল উদ্দেশ্য হলো ওই বিদেশি নারী ও তাঁর শিশুর জন্য জার্মানিতে বসবাসের আইনি অধিকার এবং বিভিন্ন ধরনের সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, কোনো জার্মান নাগরিক যদি কোনো বিদেশি শিশুর বাবা হিসেবে স্বীকৃতি দেন, তবে সেই শিশুটি সরাসরি জার্মানির নাগরিকত্ব ও পাসপোর্ট পেয়ে যায়। একই সাথে শিশুর মা-ও সন্তানের অভিভাবক হিসেবে জার্মানিতে থাকার বৈধ অধিকার লাভ করেন। এই সুযোগটির অপব্যবহার বন্ধ করতেই নতুন আইন আনা হয়েছে এবং সরকারের হিসাব অনুযায়ী, এখন থেকে প্রতি বছর প্রায় ৬৫ হাজার পিতৃত্ব স্বীকৃতির আবেদন কড়া পরীক্ষা-নিরীক্ষার মুখোমুখি হবে।
নতুন আইন অনুযায়ী, এখন থেকে কোনো জার্মান নাগরিক বা সেখানে দীর্ঘমেয়াদে থাকার অনুমতি পাওয়া ব্যক্তি যদি এমন কোনো শিশুর বাবা হতে চান যার মা জার্মানির স্থায়ী বাসিন্দা নন, তবে অবশ্যই বিদেশি নাগরিক বিষয়ক দপ্তরের অনুমতি নিতে হবে। এ ছাড়া নতুন আইনের প্রধান দিকগুলো হলো:
অনুমোদন বাতিল: যদি প্রমাণিত হয় যে ঘুষ দিয়ে, ভয় দেখিয়ে বা মিথ্যা তথ্য দিয়ে দপ্তরের অনুমোদন নেওয়া হয়েছে, তবে সেই স্বীকৃতি বাতিল করা হবে।
ফৌজদারি মামলা: পিতৃত্বের দাবিতে কোনো ধরনের মিথ্যা বা অসম্পূর্ণ তথ্য দিলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে সরাসরি ফৌজদারি মামলা করা হতে পারে।
অতিরিক্ত দলিল ও প্রমাণ: পিতৃত্বের স্বীকৃতি পেতে হলে আবেদনকারীকে এখন থেকে আগের চেয়ে অনেক বেশি কাগজপত্র, দলিল-প্রমাণ ও সঠিক ব্যাখ্যা জমা দিতে হবে।
তবে কোনো ব্যক্তি যদি খুব সহজেই চিকিৎসাগত বা আইনিভাবে প্রমাণ করতে পারেন যে তিনিই শিশুটির আসল জৈবিক পিতা, তবে তাঁর ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত অনুমোদনের কোনো প্রয়োজন হবে না।
নতুন এই আইনটি পাসের পর জার্মানির রাজনৈতিক মহল ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মধ্যে বেশ বিতর্ক শুরু হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সন্দেহজনক মনে হওয়ায় ১,৭৬৯টি ঘটনার তদন্ত করা হয়েছিল। কিন্তু তার মধ্যে সত্যি সত্যি জালিয়াতি প্রমাণিত হয়েছিল মাত্র ২৯০টি ক্ষেত্রে, অর্থাৎ বছরে গড়ে মাত্র ৭৩টি জালিয়াতির ঘটনা ধরা পড়েছিল।
এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে জার্মানির ‘গ্রিন পার্টি’-র সংসদ সদস্য ফিলিজ পোলাত অভিযোগ করেছেন, বছরে মাত্র সামান্য কয়েকটি প্রতারণার ঘটনা ঠেকানোর জন্য এখন থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার সাধারণ পরিবারকে বাড়তি আইনি ও দাপ্তরিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হবে। এ ছাড়া অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনও আশঙ্কা করছে যে, বসবাসের মর্যাদার ওপর ভিত্তি করে এই ধরনের তদন্ত শুরু হলে অনেক আসল পরিবারও অযথা হয়রানির শিকার হতে পারে। এর ফলে শিশুদের নাগরিকত্ব পাওয়া, সেখানে থাকা এবং সামাজিক সুবিধা পাওয়ার বিষয়টি ঝুঁকির মধ্যে পড়বে এবং অনেক ক্ষেত্রে শিশুরা রাষ্ট্রহীন বা পরিচয়হীন হয়ে পড়তে পারে।
তথ্যসূত্র: ইনফো মাইগ্রেন্টস বাংলা


