ইউরোপজুড়ে যখন অভিবাসনবিরোধী হাওয়া তীব্র, তখন সুইজারল্যান্ডে এক ঐতিহাসিক গণভোটে দেশের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ ১ কোটিতে (১০ মিলিয়ন) সীমাবদ্ধ করার কড়া প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছেন দেশটির ভোটাররা। কট্টর ডানপন্থী দল সমর্থিত এই প্রস্তাবটি পাস হলে তা হতো ইউরোপের কোনো দেশে অভিবাসন ঠেকাতে নেওয়া সবচেয়ে কঠোর ও নজিরবিহীন আইনি পদক্ষেপ। সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা সর্বোচ্চ ১ কোটিতে বেঁধে রাখার এবং অভিবাসনপ্রবাহে কঠোর লাগাম টানার এই বিতর্কিত প্রস্তাবটি গণভোটে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত হয়েছে। গত রবিবার অনুষ্ঠিত দেশব্যাপী এই ঐতিহাসিক ব্যালট ইনেশিয়েটিভে প্রস্তাবটির বিপক্ষে ৫৫ শতাংশ এবং পক্ষে ৪৫ শতাংশ ভোটার ভোট দেন। ফলে সরকারিভাবে প্রস্তাবটি চূড়ান্তভাবে বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে।
এই গণভোটে সুইজারল্যান্ডের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও ভৌগোলিক বিভাজন বেশ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। গ্রামীণ অঞ্চলের ভোটাররা জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পক্ষে ব্যাপক ভোট দিলেও, প্রধান প্রধান শহর, সীমান্ত এলাকা এবং বিশেষ করে পশ্চিমাঞ্চলের ফরাসিভাষী অঞ্চলের ভোটারদের তীব্র বিরোধিতার কারণে শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবটি হেরে যায়। সুইজারল্যান্ডের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল, কট্টর ডানপন্থী ‘সুইস পিপলস পার্টি’ এই গণভোটের আয়োজন করেছিল। তারা কেবল প্রথাগত অভিবাসনবিরোধিতা নয়, বরং আবাসন খরচ বৃদ্ধি, ট্রাফিক জ্যাম, পরিবেশগত টেকসইতা এবং জীবনযাত্রার মান ধরে রাখার মতো সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের সমস্যাগুলোকে সামনে এনে এই প্রচারণাকে এগিয়ে নিয়েছিল।
বর্তমানে সুইজারল্যান্ডের জনসংখ্যা প্রায় ৯১ লাখ (৯.১ মিলিয়ন), যা ২০০০ সালের পর থেকে প্রায় ২৫% বেড়েছে। যদি এই প্রস্তাবটি পাস হতো, তবে দেশের জনসংখ্যা ৯৫ লাখে পৌঁছালেই সরকারকে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে প্রাথমিক কড়াকড়ি আরোপ করতে হতো। আর জনসংখ্যা ১ কোটিতে পৌঁছানো মাত্রই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে সুইজারল্যান্ডের মুক্ত চলাচল ও কর্মসংস্থানের ঐতিহাসিক চুক্তি বাতিল করতে হতো, যা ইউরোপের সাথে দেশটির সম্পর্ককে চরম ঝুঁকিতে ফেলত।
সুইজারল্যান্ডের বিচারমন্ত্রী বিট জান্স এই জয়কে একটি ‘উন্মুক্ত ও নেটওয়ার্কড সুইজারল্যান্ড’-এর পক্ষে রায় হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ভূ-রাজনীতিক এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে ভোটাররা ইউরোপের সাথে স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য অংশীদারিত্ব বজায় রাখার পক্ষেই রায় দিয়েছেন, যা দেশের কর্মসংস্থান, সমৃদ্ধি ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জন্য অত্যন্ত জরুরি। অন্যদিকে অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও বিরোধীদের যুক্তি ছিল, এই জনসংখ্যা ক্যাপ বা সীমা সুইস অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিত। এটি উদ্যোক্তা ও প্রকৌশলীদের মতো দক্ষ বিদেশী কর্মীদের আসার পথ বন্ধ করার পাশাপাশি দেশের স্বাস্থ্য খাতে তীব্র কর্মী সংকট তৈরি করত, বিশেষ করে যখন সুইজারল্যান্ডের একটি বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী খুব দ্রুত অবসরে যাচ্ছেন।
তথ্যসূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস


