দূষণ কমানো, সবুজায়ন বাড়ানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় নেওয়া পদক্ষেপের স্বীকৃতি হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ‘ইউরোপিয়ান গ্রিন ক্যাপিটাল’ ও ‘গ্রিন লিফ’ খেতাবের জন্য এবার আটটি শহর চূড়ান্ত পর্যায়ে উঠেছে। আগামী ৮ অক্টোবর পর্তুগালের গিমারাইশে ঘোষণা করা হবে বিজয়ীদের নাম।
ইউরোপীয় কমিশনের দেওয়া এই পুরস্কারের মাধ্যমে পরিবেশগত অগ্রগতি ও বাসিন্দাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখা শহরগুলোকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এ বছর ২৭টি যোগ্য শহরের আবেদন থেকে আটটিকে চূড়ান্ত তালিকায় রাখা হয়েছে।
এর মধ্যে পাঁচটি শহর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে ‘ইউরোপিয়ান গ্রিন ক্যাপিটাল ২০২৮’ খেতাবের জন্য। এগুলো হলো—ডেনমার্কের আলবর্গ, পোল্যান্ডের বিলস্কো-বিয়ালা, স্লোভাকিয়ার কোশিৎসে, পর্তুগালের পোর্তো এবং স্পেনের জারাগোজা।
আর ছোট শহরের জন্য ‘ইউরোপিয়ান গ্রিন লিফ ২০২৮’ খেতাবের চূড়ান্ত তালিকায় রয়েছে স্পেনের বেনিডর্ম ও চিক্লানা দে লা ফ্রন্তেরা এবং পর্তুগালের এস্তারেজা।
কীভাবে বাছাই করা হয়?
১ লাখের বেশি জনসংখ্যার শহরগুলো ‘গ্রিন ক্যাপিটাল’ খেতাবের জন্য আবেদন করতে পারে। আর ২০ হাজার থেকে ১ লাখ জনসংখ্যার শহরগুলো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ‘গ্রিন লিফ’ খেতাবের জন্য।
স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের একটি প্যানেল শহরগুলোর পরিবেশগত কার্যক্রম সাতটি ক্ষেত্রে মূল্যায়ন করেছে। এগুলো হলো—বায়ুর মান, পানি ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য ও সবুজ এলাকা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শব্দদূষণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সক্ষমতা।
চূড়ান্ত তালিকায় থাকা শহরগুলোর প্রত্যেকটিরই আলাদা কিছু শক্তিশালী দিক রয়েছে।
স্পেনের জারাগোজা জীববৈচিত্র্য ও সবুজ এলাকার জন্য ভালো করেছে। শহরটি পার্ক, নদীর তীর, জলাভূমি, সড়কের গাছপালা ও আশপাশের প্রাকৃতিক এলাকাগুলোকে একটি সমন্বিত সবুজ নেটওয়ার্কের আওতায় আনার চেষ্টা করছে। এতে বন্যপ্রাণীর চলাচলের সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি বন্যার ঝুঁকিও কমবে।
পর্তুগালের পোর্তো পানি ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলার প্রস্তুতিতে এগিয়ে রয়েছে। গত এক দশকে শহরটি রিও তিয়েতো নদীর তলদেশ ও তীর পুনরুদ্ধারে কাজ করেছে। ভারী বৃষ্টির পানি ধরে রাখার জন্য নতুন পার্ক তৈরি করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিশোধিত বর্জ্যপানি কৃষিকাজে সেচ ও সড়ক পরিষ্কারের কাজে পুনর্ব্যবহার শুরু হয়েছে।
অন্যদিকে স্পেনের পর্যটননির্ভর শহর বেনিডর্ম শহুরে এলাকায় সবুজের পরিমাণ বাড়ানোর জন্য প্রশংসা পেয়েছে। ২০১২ সাল থেকে শহরটির উন্মুক্ত বাগানের আয়তন ৩ লাখ ৫০ হাজার বর্গমিটার থেকে বেড়ে ১৫ লাখ বর্গমিটারের বেশি হয়েছে। একই সময়ে গাছের সংখ্যাও প্রায় চার গুণ হয়েছে। বর্তমানে শহরটির ৯২ শতাংশ বাসিন্দা ৩০০ মিটারের মধ্যে কোনো না কোনো উন্মুক্ত সবুজ এলাকার সুবিধা পান।
আগামী ৭ ও ৮ অক্টোবর চূড়ান্ত তালিকায় থাকা শহরগুলো আন্তর্জাতিক জুরির সামনে নিজেদের পরিকল্পনা তুলে ধরবে। এরপর ৮ অক্টোবর গিমারাইশে পুরস্কার অনুষ্ঠানে বিজয়ীদের নাম ঘোষণা করা হবে।
‘ইউরোপিয়ান গ্রিন ক্যাপিটাল’ বিজয়ী শহর পরিবেশগত পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ৬ লাখ ইউরো পাবে। আর ‘গ্রিন লিফ’ খেতাবের বিজয়ী এক বা দুইটি শহরকে পরিবেশবান্ধব প্রকল্প ও জনসম্পৃক্ত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রত্যেককে ২ লাখ ইউরো করে দেওয়া হবে।
গরম বাড়ায় বদলে যাচ্ছে ইউরোপের শহর
ইইউর এই স্বীকৃতির পেছনে রয়েছে ইউরোপের শহরগুলোর নগর পরিকল্পনায় বড় ধরনের পরিবর্তন। গ্রীষ্মকাল আরও উষ্ণ হয়ে ওঠা এবং আবহাওয়ার ধরন অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় অনেক শহরই গাছ, পার্ক ও জলাধারের জন্য আরও জায়গা রাখছে।
স্পেনের বার্সেলোনায় যান চলাচলের জন্য কিছু সড়ক বন্ধ করে সেগুলো পার্ক ও পথচারীদের এলাকায় পরিণত করা হয়েছে।
ইতালির মিলানে ‘বস্কো ভার্তিকালে’ নামে দুটি আবাসিক ভবনও শহরে সবুজায়নের একটি উদাহরণ। ভবন দুটির বারান্দায় ২১ হাজারের বেশি গাছ ও গুল্ম রয়েছে।
নেদারল্যান্ডসের ব্রেডায়ও নাগরিকদের অংশগ্রহণে শহরের পরিবেশ বদলে গেছে। কংক্রিটের টাইলস সরিয়ে সেখানে ঘাস, ফুলের বাগান ও গাছ লাগানো হয়েছে। বাড়ি ও স্কুলের ছাদেও তৈরি করা হয়েছে বাগান। বর্তমানে শহরটির প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকাই সবুজ। এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা এসব উদ্যোগের ফলে ২০২৫ সালে ব্রেডা ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রথম ‘ন্যাশনাল পার্ক সিটি’ হিসেবে স্বীকৃতি পায়।
তবে ‘গ্রিন সিটি’ খেতাবের বিষয়টি শুধু শহরে গাছ লাগানো বা ভবনের চারপাশে সবুজায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। জার্মানির হাইলব্রন ২০২৭ সালের ‘গ্রিন ক্যাপিটাল’ নির্বাচিত হয়েছে পরিচ্ছন্ন বায়ু ও পানি, শব্দদূষণ কমানো এবং বর্জ্য কমানোর মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতির জন্য।
আগামী সপ্তাহে জুরি মূলত দেখবে, চূড়ান্ত তালিকায় থাকা আটটি শহর পরিবেশবান্ধব এসব উদ্যোগকে কতটা শহরজুড়ে কার্যকর পরিবর্তনে রূপ দিতে পেরেছে


