দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ লাওসে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ, ওয়ার্ক পারমিট ও প্রবেশ ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে স্থগিত হওয়ার কারণ খুঁজছে বাংলাদেশ। তবে লাওসের সরকার বলছে, দেশটিতে বাংলাদেশের শ্রমবাজার বড় না হলেও বাংলাদেশি কর্মীরা প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। অবৈধ প্রবেশ, মানব পাচার ও অননুমোদিতভাবে বিদেশি শ্রমিক নিয়োগ ঠেকাতেও বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে বাংলাদেশি নাগরিকদের নতুন করে শ্রমিক নিয়োগ, ওয়ার্ক পারমিট ও শ্রমিক শ্রেণির ভিসা ইস্যু সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে লাওস। এই স্থগিতাদেশ আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
এ সময়ে লাওসে যেতে ইচ্ছুক বাংলাদেশি কর্মীদের কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে পাসপোর্ট জমা না দেওয়া এবং কোনো ধরনের আর্থিক লেনদেন না করার পরামর্শ দিয়েছে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়।
তবে স্থগিতাদেশের নির্দিষ্ট কারণ জানায়নি মন্ত্রণালয়।
প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বিবিসি বাংলাকে বলেন, লাওস সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ জানায়নি। বিষয়টি জানতে বাংলাদেশ এরই মধ্যে উদ্যোগ নিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে খোঁজ-খবর নিতে বলছি, এখনও আমাদেরকে আপডেট জানায়নি। লাওসে আমাদের দূতাবাস নেই। পাশের দূতাবাসের মাধ্যমে আমরা অলরেডি বলেছি এই বিষয়টি জানার জন্য এবং ওখানে বাজার, শ্রমবাজারের প্রেক্ষাপট কী, আমাদের সম্ভাবনা কী—এগুলো জেনে রিপোর্ট করতে ওনাদেরকে বলেছি।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর এক কর্মকর্তা বলেন, লাওসে বাংলাদেশি শ্রমিকরা মূলত বিভিন্ন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। অনেক প্রতিষ্ঠানে কাজের পরিমাণ কমে যাওয়ায় শ্রমিকের চাহিদাও কমে থাকতে পারে।
এর আগে গত ১৪ সেপ্টেম্বর লাওসের সংবাদমাধ্যম দ্য লাওশিয়ান টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশি নাগরিকদের নতুন করে ওয়ার্ক পারমিট দেওয়া, শ্রমিক আমদানির পরিকল্পনা এবং শ্রম প্রকল্পের অনুমোদন স্থগিত করেছে দেশটির সরকার।
তবে চুক্তিতে কাজের সময়সূচি নির্ধারিত থাকা লাওস সরকারের অনুমোদিত বড় অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্পগুলো এই স্থগিতাদেশের আওতামুক্ত থাকবে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
কেন স্থগিত লাওসে বাংলাদেশি শ্রমিক নেওয়া?
লাওসের শ্রম ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ৯ সেপ্টেম্বরের আদেশের বরাতে দ্য লাওশিয়ান টাইমস জানায়, অবৈধ প্রবেশ, মানব পাচার, অননুমোদিত শ্রমিক সরবরাহকারী এবং বিদেশ থেকে শ্রমিক আনার পর দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়া নিয়োগদাতাদের নিয়ন্ত্রণ করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
তবে শুধু বাংলাদেশি নাগরিকদের লক্ষ্য করে কেন এই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে দেশটির শ্রম মন্ত্রণালয়ের আদেশে সুস্পষ্ট কোনো কারণ উল্লেখ করা হয়নি।
বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, লাওস ও কম্বোডিয়ার মতো দেশে বাংলাদেশি কর্মীরা প্রতারণার শিকার হওয়ায় কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে আরও সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘এই সমস্ত দেশে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের দিক থেকেও নানান ধরনের… আমরা একটু ডকুমেন্টসগুলো স্ট্রংলি ভেরিফাই করতেছি।’
‘কারণ হচ্ছে যে, এই সমস্ত দেশে গিয়ে অনেকে স্ক্যামের শিকার হচ্ছে, প্রতারণার শিকার হচ্ছে। সো, যে কারণে আমরা একটু এই ক্ষেত্রে, এরা কী কাজে যাচ্ছে, কতদিনের জন্য যাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে—এগুলো একটু ভালোভাবে ভেরিফাই করতেছি,’ বলেন প্রতিমন্ত্রী।
দ্য লাওশিয়ান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, এই আদেশের কারণে কোনো ব্যক্তি, কোম্পানি, নিয়োগদাতা বা লেবার অপারেটর স্বাধীনভাবে বাংলাদেশি নাগরিকদের লাওসে প্রবেশ বা কর্মসংস্থানের অনুমতি দিতে পারবে না।
আইন লঙ্ঘনকারীদের আর্থিক জরিমানা, নিজ দেশে ফেরত পাঠানো এবং ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বাতিলের মতো ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
অনুমোদন ছাড়া শ্রমিক আনলে বা নিয়োগ করলে নিয়োগদাতাকে প্রতি ঘটনায় শ্রমিকপ্রতি ২৫ লাখ লাও কিপ বা ১১০ মার্কিন ডলার জরিমানা করা হবে। অন্য শ্রমিক ইউনিটে নিয়োগের জন্য শ্রমিক আনলেও একই জরিমানা দিতে হবে।
অন্য শ্রমিক ইউনিটের জন্য নির্ধারিত কোনো শ্রমিককে কাজে ব্যবহার বা গ্রহণ করলে নিয়োগদাতাকে প্রতি ঘটনায় শ্রমিকপ্রতি ২০ লাখ লাও কিপ বা ৮৯ মার্কিন ডলার জরিমানা করা হবে।
অনুমোদন ছাড়া অননুমোদিত কর্মস্থলে কাজ করলে শ্রমিককে প্রতি ঘটনায় ১০ লাখ লাও কিপ বা ৪৪ মার্কিন ডলার জরিমানা দিতে হবে। একইসঙ্গে তাকে ৩০ দিনের মধ্যে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।
দেশে ফেরত পাঠানোসহ যাতায়াতের সব খরচ নিয়োগদাতা বা আইন ভঙ্গকারী পক্ষকে বহন করতে হবে। একই ধরনের অপরাধ আবার করলে জরিমানার পরিমাণ তিন গুণ হবে এবং অন্যান্য আইনগত ব্যবস্থাও নেওয়া হতে পারে।
লাওসে কেন যান বাংলাদেশি শ্রমিকরা?
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শ্রমিকরা সাধারণত লাওসের নির্মাণ ও উৎপাদন খাতে কাজ করেন।
দেশটিতে ঠিক কতজন বাংলাদেশি কর্মী রয়েছেন, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারেননি প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক।
তবে একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে প্রায় ৩ হাজার বাংলাদেশি কর্মী লাওসে যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছেন। বাংলাদেশি কর্মী অভিবাসনের তালিকায় দেশটির অবস্থান ১৩তম। গত বছর ৩ হাজার ৮৩৫ জন বাংলাদেশি কর্মী লাওসে যাওয়ার ছাড়পত্র নিয়েছিলেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, লাওস বাংলাদেশের বড় কোনো শ্রমবাজার নয়। কিছু চীনা প্রকল্পে বাংলাদেশি কর্মীরা সেখানে যান।
তিনি বলেন, ‘আসলে লাওসের ইকোনমিক কন্ডিশন তো খুব ভালো না। ওখানে চাইনিজ কিছু প্রজেক্টে অল্প কিছু লোকজন যায় আমরা জানি। কিন্তু এক্সাক্ট ফিগারটা আমার কাছে এই মুহূর্তে নাই যে কতজন কর্মী লাওসে আছে।’
তার ভাষ্য, কিছু রিক্রুটিং এজেন্সি ভুয়া কোম্পানির সঙ্গে যোগসাজশ করে লাওসের বিভিন্ন কাজের জন্য চাহিদাপত্র নিয়ে আসছে। প্রকৃতপক্ষে ওই কাজ বা কোম্পানির অস্তিত্ব না থাকায় বিষয়টি এখন কঠোরভাবে যাচাই করা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু লাওস বা কম্বোডিয়া নয়, অবৈধভাবে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশিদের যাওয়া ঠেকাতেও সরকার কাজ করছে।
তিনি বলেন, ‘বিশেষ করে ইউরোপেও যাওয়ার ক্ষেত্রে, বিশেষ করে যারা অবৈধ পথে ইতালি যায় কিংবা সার্বিয়া হয়ে—মোট কথা হচ্ছে আমরা একটা রেগুলার মাইগ্রেশন সিস্টেম এনশিওর করার জন্য যে সমস্ত জায়গায় অনিয়মিত এই ধরনের গমন আছে কিংবা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যারা এই ভূমধ্যসাগর পার হয়ে যাচ্ছে, এই সমস্ত বিষয়গুলো বন্ধে আমরা সচেতনতামূলক কার্যক্রমের পাশাপাশি দেশের মধ্যে নানা ধরনের কর্মকাণ্ড আমরা করছি।’


