যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি পুরুষদের সমকামী হিসেবে সাজিয়ে ভুয়া আশ্রয় আবেদন তৈরিতে সহায়তার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির অভিবাসন কর্তৃপক্ষ।
অভিযোগ রয়েছে, একটি চক্র ভুয়া নথি, সাজানো ছবি এবং সমকামী সম্পর্কের দাবির পক্ষে বিভিন্ন প্রমাণ তৈরি করে দিত। এসবের বিনিময়ে আবেদনকারীদের কাছ থেকে সর্বোচ্চ সাড়ে ৪ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত নেওয়া হতো, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৭ লাখ ৩৩ হাজার টাকা।
লন্ডনে অভিযান, গ্রেপ্তার ৩
মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) লন্ডনের কয়েকটি ঠিকানায় অভিযান চালান যুক্তরাজ্যের হোম অফিসের ইমিগ্রেশন এনফোর্সমেন্ট কর্মকর্তারা।
এ সময় দুজনকে প্রতারণা ও অভিবাসনসংক্রান্ত অপরাধের সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের কাছ থেকে মোবাইল ফোন, গয়না এবং হাজার হাজার পাউন্ড নগদ অর্থ জব্দ করা হয়েছে।
আরেকজনকে যুক্তরাজ্যে অবৈধভাবে অবস্থানের সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়।
হোম অফিসের অপরাধ তদন্ত বিভাগের আঞ্চলিক কর্মকর্তা ক্রিস ফস্টার বলেন, সন্দেহভাজন চক্রটি বাংলাদেশি পুরুষদের সমকামী পরিচয়ে আশ্রয়ের আবেদন তৈরিতে সহায়তা করত।
ভুয়া ছবি ও নথি তৈরির অভিযোগ
ফস্টারের ভাষ্য অনুযায়ী, চক্রটি এসব কাজের জন্য এক হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত নিত বলে গোয়েন্দা তথ্য রয়েছে।
এর বিনিময়ে সমকামী সংগঠনের সমর্থনপত্র, সাজানো ছবি এবং সমকামী সম্পর্কের দাবির পক্ষে চিঠি তৈরি করে দেওয়া হতো। এসব চিঠিতে আবেদনকারীর সঙ্গে অন্য কোনো ব্যক্তির বন্ধুত্ব বা সমকামী সম্পর্কের কথাও উল্লেখ করা হতো।
হোম অফিস জানিয়েছে, এই চক্রের সঙ্গে যুক্ত শতাধিক আশ্রয় আবেদন এখন পর্যালোচনা করা হচ্ছে। ফস্টার বলেন, এসব আবেদনের কিছু ভুলভাবে অনুমোদিত হয়ে থাকতে পারে বলে তারা প্রায় নিশ্চিত।
বাংলাদেশি সংগঠনের নামও এসেছে
হোম অফিসের কর্মকর্তারা বলছেন, তদন্তে পূর্ব লন্ডনের হোয়াইটচ্যাপেলভিত্তিক বাংলাদেশি কমিউনিটির এলজিবিটি সংগঠন ‘আপনজন’-এর নামও এসেছে।
অভিবাসন কর্মকর্তারা কয়েক মাস ধরে সংগঠনটির কার্যক্রম তদন্ত করছিলেন।
কর্মকর্তাদের দাবি, আশ্রয়প্রার্থীদের অনেকে প্রথমে রাজনৈতিক কারণে আশ্রয়ের আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর পরে যৌন পরিচয়কে নতুন ভিত্তি হিসেবে সামনে আনতেন।
হোম অফিসের ভাষ্য অনুযায়ী, একটি ঘটনায় এক ব্যক্তি তার মূল আশ্রয় আবেদনের নয় বছর পর প্রথমবার নিজেকে সমকামী বলে দাবি করেন।
আদালতে প্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন
যুক্তরাজ্যের অভিবাসন বিচারকেরা এর আগে ‘আপনজন’-এর দেওয়া কিছু প্রমাণকে অবিশ্বস্ত বা গ্রহণযোগ্য নয় বলে মন্তব্য করেছেন।
একজন আবেদনকারী সংগঠনটির বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার দাবি করেছিলেন। তার জমা দেওয়া ছবিকে সাজানো বলে মনে করেছিলেন বিচারক।
হোম অফিসের দাবি, রাজনৈতিক কারণে আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর যৌন পরিচয়ের ভিত্তিতে আবেদন করা কিছু পুরুষের পক্ষে সংগঠনটি সাক্ষ্য দিত।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
বিবিসির অনুসন্ধানের পর নতুন অভিযান
চলতি বছর বিবিসির এক অনুসন্ধানে যুক্তরাজ্যে ভুয়া সমকামী পরিচয় ব্যবহার করে আশ্রয় আবেদন তৈরির অভিযোগ সামনে আসে। ওই অনুসন্ধানে আইনজীবী ও পরামর্শদাতাদের বিরুদ্ধে অভিবাসীদের সমকামী হিসেবে সাজিয়ে আশ্রয়ের আবেদন তৈরিতে সহায়তার অভিযোগ করা হয়েছিল।
এরপর হোম অফিসের তদন্তে নতুন করে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটল।
বিবিসির অনুসন্ধানে তানিসা খান নামে এক পরামর্শদাতার কথাও উঠে আসে। গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা কথোপকথনে তিনি সমকামী ক্লাবে তোলা ছবি ও অন্যান্য সহায়ক প্রমাণসহ একটি ‘সম্পূর্ণ প্যাকেজ’ দেওয়ার কথা বলেছিলেন।
তানিসা খানের সঙ্গে ‘ওরচেস্টার এলজিবিটি’ নামে একটি কমিউনিটি সংগঠনের সম্পর্ক ছিল। সংগঠনটি পরে বন্ধ হয়ে যায়।
তবে সংগঠনটির প্রতিষ্ঠাতা ভুয়া প্রমাণ তৈরিতে সহায়তার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তানিসা খানও ভুয়া আবেদন বা জাল প্রমাণ তৈরির পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
‘প্রকৃত আশ্রয়প্রার্থীদের ক্ষতি করছে’
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ বলেছেন, নিপীড়নের ভুয়া দাবি করা ব্যক্তিরা প্রকৃত সুরক্ষা প্রত্যাশীদের ক্ষতি করছেন।
তিনি বলেন, এ ধরনের প্রতারণা করে অর্থ উপার্জনকারী চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আশ্রয় ব্যবস্থায় প্রতারণা প্রমাণিত হলে আবেদন বাতিল এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে যুক্তরাজ্য থেকে সরিয়ে দেওয়া হতে পারে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
যুক্তরাজ্যে আশ্রয় জালিয়াতির জন্য সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।


